১২/০২/২০২৬, ১৬:৫৯ অপরাহ্ণ
28 C
Dhaka
১২/০২/২০২৬, ১৬:৫৯ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

তারুণ্যের চোখে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন, প্রত্যাশা, শঙ্কা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন

দীর্ঘ ১৭ বছর পর আজ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে ভিন্ন এক আবহ। নগর থেকে গ্রাম—চায়ের দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন নির্বাচন। উৎসবমুখর এই পরিবেশের ভেতরেই কাজ করছে প্রত্যাশা, আগ্রহ ও আনন্দ—পাশাপাশি খানিকটা শঙ্কাও। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে ভাবনা যেন আরও গভীর, আরও সচেতন।

বিজ্ঞাপন

ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ৪৮তম ব্যাচের রাতুল সাহা বলেন, দীর্ঘদিন পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে চারদিকে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে এবং দেশের আপামর জনতা নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার জন্য অপেক্ষায় আছে। সেই সঙ্গে জনগণ একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করছে। নির্বাচনে অবশ্যই সহিংসতা যেন না হয়, সে দিকে আমাদের সকল রাজনৈতিক দলকেই খেয়াল রাখতে হবে।

এবারের নির্বাচনকে আমি কেবল ক্ষমতা বদলের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছি না; বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দিকনির্দেশ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ বলেও মনে করি। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে একধরনের আশা, আগ্রহ ও আনন্দ কাজ করছে। একই সঙ্গে খানিকটা শঙ্কাও রয়েছে—ভোটের মাধ্যমে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরা সংসদে যেতে পারবেন তো!

আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতার মালিক জনগণ। এজন্য জনগণকে রাজনৈতিকভাবে এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা ও নীতিগত গভীরতা কতটুকু আছে—এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি। শুধু বক্তৃতার জোর, আবেগী কথাবার্তা কিংবা অবান্তর প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করলে দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল নাও আসতে পারে।

আমরা এমন প্রতিনিধিদের সংসদে দেখতে চাই, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে প্রকৃতপক্ষে জনগণের কথা বলবেন এবং দেশের জন্য সঠিক আইন ও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখবেন।

গণতান্ত্রিক পথে পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে—পুরোনো ধ্যানধারণা নয়, বরং নতুন চিন্তা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেশ পরিচালনা করা। একই সঙ্গে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে গণতন্ত্রের আড়ালে আর কোনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সুযোগ না থাকে। সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হোক।

এই দেশ কোনও একক গোষ্ঠীর নয়; জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার সম্মিলিত পরিচয়। তাই সবাইকে সঙ্গে নিয়েই নতুনভাবে দেশ গড়ার পথচলা শুরু করতে হবে। আগামী দিনের রাজনীতি হতে হবে মানুষের কল্যাণকেন্দ্রিক, সাধারণ নাগরিকের স্বার্থনির্ভর এবং স্পষ্ট নীতিমালাভিত্তিক।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ৪৮তম ব্যাচের বুলবুল হাসনাত ফাহিম বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে জীবনের প্রথম ভোট প্রদান করা আমার কাছে কেবল একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়; বরং দেশের ভাগ্য নির্ধারণে সরাসরি অংশগ্রহণের এক অনন্য সুযোগ। বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে, আর এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারাটা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের।

নির্বাচন মানেই গণতন্ত্রের এক মহাউৎসব। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার প্রথম চাওয়া—এই উৎসব যেন হয় প্রাণবন্ত, অংশগ্রহণমূলক এবং সবচেয়ে বড় কথা, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। প্রতিটি ভোটার যেন কোনও ভয়ভীতি বা সংশয় ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন। জনমতের সঠিক প্রতিফলনই একটি শক্তিশালী সংসদ উপহার দিতে পারে।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই আমি এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি, যারা শিক্ষাবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী এবং সুশাসনে বিশ্বাসী।

ভবিষ্যতের অঙ্গীকার—আমার ভোটটি সেই প্রার্থীর জন্য, যিনি বিভেদ নয় বরং জাতীয় ঐক্যের ডাক দেবেন; যিনি আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা দেবেন। আমরা যারা নতুন প্রজন্মের ভোটার, আমাদের শক্তি আমাদের সচেতনতা। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের এই ক্ষুদ্র একটি ‘সিল’ আগামীর একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

৫০তম ব্যাচ, টেক্সটাইল মেশিনারি ডিজাইন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্সের মো. শিহাব হোসেন বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং এবারে জীবনের প্রথম ভোটার হিসেবে এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারা আমার জন্য গর্বের। নির্বাচন একটি দেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা—নির্বাচন হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। প্রতিটি ভোটার যেন ভয় বা চাপ ছাড়াই নিজের মত প্রকাশ করতে পারে।

আমি চাই যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব সামনে আসুক, যারা ব্যক্তিস্বার্থ নয়; বরং দেশের উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেবে।

আমি বিশ্বাস করি, ভোট শুধু একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই আমি এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি, যারা শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

নির্বাচন যেন বিভেদ সৃষ্টি না করে; বরং জাতীয় ঐক্য, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ভিত্তি আরও মজবুত করে—এটাই আমার প্রত্যাশা।

৫১তম ব্যাচ, টেক্সটাইল মেশিনারি ডিজাইন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্সের ইমতিয়াজ আহমেদ সিয়াম বলেন, জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যে কোনও নাগরিকের জন্যই বিশেষ। তবে স্বৈরাচারের পতনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে ঘিরে এক তরুণ ভোটারের উচ্ছ্বাস যেন কিছুটা ভিন্নমাত্রা পেয়েছে।

এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই শুরু হয় জুলাই আন্দোলন। পরীক্ষার মাঝেও পড়ালেখায় মন বসত না; বই পাশে রেখেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের আপডেট খোঁজা ছিল প্রতিদিনের অভ্যাস। সেই সময়ের আন্দোলন, উদ্বেগ ও প্রত্যাশা আমাদের প্রজন্মের চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলেও নির্বাচন ঘিরে আগ্রহ ও ভাবনা এখনো তীব্র।

নির্বাচন নিয়ে আমার প্রত্যাশা খুবই সহজ। যে-ই জিতুক, হাদি ভাইয়ের হত্যার বিচার করতে হবে। আর যারা হেরে যাবে, তারা যেন পরাজয় স্বীকার করেন। গণতন্ত্রে এটুকু সংস্কৃতি থাকা জরুরি বলেই আমি মনে করি। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রায় সব দলই জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। তাই ক্ষমতায় যে-ই আসুক, আমার প্রত্যাশা—জুলাইয়ের দাবিগুলো যেন বাস্তবায়ন করা হয়।

আমি মনে করি, আজকের ভোটকেন্দ্রের লম্বা লাইনই হবে সবচেয়ে বড় বার্তা। জনগণের উপস্থিতিই প্রমাণ করবে—স্বৈরাচারের জায়গা এই দেশে আর নেই।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি প্রজন্মের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ ভাবনার প্রতিফলন। তরুণ ভোটারদের কণ্ঠে স্পষ্ট—তারা পরিবর্তন চায়, কিন্তু তা হোক গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও নীতিনিষ্ঠ পথে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—ভোটের সিল কি সত্যিই গড়ে দেবে নতুন বাংলাদেশ? উত্তর লুকিয়ে আছে ভোটকেন্দ্রের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণদের চোখে, যাদের প্রত্যাশা—সৎ, যোগ্য এবং জনকল্যাণে নিবেদিত নেতৃত্বের হাতে দেশ এগিয়ে যাক নতুন ভোরের দিকে।

পড়ুন:খুলনায় ভোটকেন্দ্রের সামনে উত্তেজনা, বিএনপি নেতার মৃত্যু

দেখুন:নির্বাচন ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার 

ইম/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন