নির্বাচনই নির্ধারণ করে দেয় একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গতিপথ। দীর্ঘ প্রচার-প্রচারণা, নির্বাচনের দিনের টানটান উত্তেজনা আর ফল ঘোষণার দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে শুরু হয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়–সরকার গঠন। সাধারণ মানুষের চোখে প্রক্রিয়াটি সহজ মনে হলেও, এর প্রতিটি বাঁকে রয়েছে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতি।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ শেষে এখন দেশজুড়ে অপেক্ষার পালা–কবে এবং কার হাতে উঠছে আগামীর শাসনভার। এখন কেবল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষা। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে বঙ্গভবনের দরবার হল পর্যন্ত এখন এক সুদীর্ঘ ও সাংবিধানিক কর্মযজ্ঞের প্রস্তুতি চলছে। মূলত ফলাফল থেকে গেজেট প্রকাশ, সংসদ সদস্যদের শপথ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সরকার গঠনের আহ্বানের মাধ্যমেই পূর্ণতা পায় একটি নতুন মন্ত্রিসভা।
বাংলাদেশের সংবিধান ও সংসদীয় রীতিনীতি অনুযায়ী সরকার গঠনের ধাপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
নির্ধারিত দিনে দেশজুড়ে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রিজাইডিং অফিসাররা নিজ নিজ কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করেন। এরপর রিটার্নিং অফিসারদের মাধ্যমে সেই ফলাফল একত্রিত করে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়। এরপর ধাপে ধাপে বেসরকারি ফল প্রকাশ করা হয় এবং শেষে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করে। বাংলাদেশে এই দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ীদের নাম, ঠিকানা ও নির্বাচনী এলাকা উল্লেখ করে সরকারি ‘গেজেট’ প্রকাশ করে। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আইনি বৈধতা নিশ্চিত হয়।
গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ করতে হয়। সাধারণত স্পিকার নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। যদি স্পিকার নিজে প্রার্থী থাকেন এবং জয়ী হন, তবে তিনি প্রথমে নিজে শপথ নেন এবং পরে অন্যদের শপথ পড়ান। শপথ গ্রহণের পরই তারা আইনত সংসদ সদস্যের মর্যাদা লাভ করেন। তবে এবার পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার না থাকায় বিশেষ সাংবিধানিক বিধান কার্যকর হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার না থাকলে সংবিধানের ১৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তি (যেমন: প্রধান বিচারপতি) নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়াতে পারেন। এ ছাড়া গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ না হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শপথ পড়ানোর এখতিয়ার রাখেন।
শপথ নেয়ার পর বিজয়ীদের মধ্য থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া দলটি তাদের ‘সংসদীয় দলের’ বৈঠক ডাকে। সেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা তাদের নেতার নাম প্রস্তাব করেন। ত্রয়োদশ সংসদের প্রেক্ষাপটে, বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেই সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হবে–এটিই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।
সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর সেই নাম রাষ্ট্রপতিকে জানানো হয়। সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সেই সদস্যকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন, যার প্রতি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা রয়েছে বলে তার কাছে প্রতীয়মান হয়। রাষ্ট্রপতি এরপর তাকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।
প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের পর তার পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নিয়োগ দেন। এরপর বঙ্গভবনের দরবার হলে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে এবং পরে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করান। শপথের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দফতর বণ্টন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
মন্ত্রিসভা গঠনের পর রাষ্ট্রপতি সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। এই প্রথম অধিবেশনে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। এর মাধ্যমেই একটি নতুন সংসদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

