১৬/০২/২০২৬, ১৭:৪৪ অপরাহ্ণ
27 C
Dhaka
১৬/০২/২০২৬, ১৭:৪৪ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

নব-নির্বাচিত সরকারের প্রথম ১২০ দিনই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ পথরেখা

জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নতুন সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন জনগণের প্রত্যাশা কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়—বরং শাসনব্যবস্থার চরিত্র, নীতির অগ্রাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের দৃশ্যমান পরিবর্তন। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী, ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা স্পষ্ট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য প্রকট এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে—তখন প্রথম ১২০ দিন হয়ে ওঠে একটি নীতিগত রিসেটের সময়। এই সময় সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; কিন্তু এই সময়ই বলে দেয় সরকার কোন পথে হাঁটবে, কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রদর্শন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল হবে।

প্রথমত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ছাড়া অন্য কোনো সংস্কার টেকসই হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল বাজার তদারকি বা ভ্রাম্যমাণ আদালত যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত “ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্রেমওয়ার্ক”, যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা—আমদানি পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত—ডেটাভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে।

সীমিত সময়ের জন্য শুল্ক-ভ্যাট সমন্বয়, কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা, সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি মূল্যস্ফীতি কমাতে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সংকোচনমূলক কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি বাজারে তারল্য শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। সুদের হার নীতিতে ভারসাম্য আনতে হবে—একদিকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে বিনিয়োগ উৎসাহ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুদহ্রাস কর্মসূচি অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা। খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব দীর্ঘদিন ধরে এই খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। প্রথম ১২০ দিনেই একটি স্বাধীন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বোর্ড গঠন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত পৌঁছাবে।

একই সঙ্গে এসএমই ও স্টার্টআপ খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করা হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ত্বরান্বিত হবে। অর্থনীতি কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব নয়; এটি আস্থার বিষয়—আর সেই আস্থাই এখন পুনর্গঠনের মূল চাবিকাঠি।

কর ব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি। বিলাসদ্রব্যে কর বাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, কর প্রশাসনের পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং করজালের পরিধি বাড়ানো হলে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে এবং করদাতার হয়রানি কমবে।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও ২৪/৭ অপারেশন নিশ্চিত করলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়বে। উৎপাদনমুখী শিল্পে স্বল্পসুদে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং সহজ লজিস্টিক সাপোর্ট শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে।

দেশের বাণিজ্য ও শিল্পখাতের মাদার সংগঠন Federation of Bangladesh Chambers of Commerce and Industry (এফবিসিসিআই) দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু যদি ব্যবসায়ী সমাজ মনে করে তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল, তাহলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও আস্থার সংকট তৈরি হয়।

নতুন সরকারের উচিত প্রথম ১২০ দিনের মধ্যেই এফবিসিসিআইসহ সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পন্ন করা। এর গুরুত্ব শুধু সাংগঠনিক নয়—এটি অর্থনৈতিক বার্তা। নির্বাচিত ও যোগ্য ব্যবসায়ী নেতৃত্ব সামনে এলে নীতিনির্ধারণে বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। ব্যাংকিং, রপ্তানি, করনীতি কিংবা শিল্পায়ন—সব ক্ষেত্রেই সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব জোরদার হয়। একটি কার্যকর এফবিসিসিআই মানে একটি শক্তিশালী পাবলিক-প্রাইভেট ডায়ালগ প্ল্যাটফর্ম। বিনিয়োগকারীরা তখন বুঝতে পারেন—নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ স্থিতিশীল।

স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য আজ সামাজিক স্থিতিশীলতার বড় ঝুঁকি। শহরভিত্তিক বিশেষায়িত সেবা বাড়লেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনো মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। প্রথম ১২০ দিনেই উপজেলা পর্যায়ে টেলিমেডিসিন সংযোগ বাধ্যতামূলক করা, সরকারি হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা এবং একটি জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা কাঠামোর খসড়া প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ নিজের পকেট থেকে বহন করা পরিবারগুলোর ওপর চাপ কমবে।

মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় মোবাইল মেডিকেল ইউনিট চালু করলে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব। স্বাস্থ্য খাত কেবল সামাজিক সেবা নয়; এটি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার ভিত্তি।

ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা; কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই অগ্রগতি ঝুঁকির মুখে পড়বে। একটি জাতীয় সাইবার রেসপন্স টাস্কফোর্স গঠন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার অডিট এবং তথ্য সুরক্ষা আইন শক্তিশালী করা জরুরি। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য ও সরকারি ডেটাবেসে বহুপদ নিরাপত্তা কাঠামো চালু করতে হবে। “ডিজিটাল পাবলিক সার্ভিস ফাস্ট ট্র্যাক” চালু করে জন্মনিবন্ধন, ভূমি রেকর্ড, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত সনদ একক ডিজিটাল আইডির মাধ্যমে সংযুক্ত করা গেলে প্রশাসনিক খরচ ও সময় কমবে।

একই সঙ্গে ডিজিটাল রূপান্তরের পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশকে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তি নির্মাতা রাষ্ট্রে পরিণত হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে এআই ডিপ্লোমেসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতা এখন কেবল সফটওয়্যার বা সেবা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা আর্কিটেকচার এবং কৌশলগত প্রযুক্তি সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি ট্রান্সফার এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ডোমেস্টিক সেমিকন্ডাক্টর এবং চিপ তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি সক্ষমতা গড়ে তুলতে একটি এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার পলিসি কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটি জাতীয় ডেটা সেন্টার, ক্লাউড গভর্ন্যান্স, হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং, সরকারি ডেটা স্ট্যান্ডার্ড এবং সাইবার সিকিউরিটি আর্কিটেকচার নির্ধারণে কাজ করবে। একটি সমন্বিত ন্যাশনাল এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার রোডম্যাপ তৈরি করে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ডেটা শেয়ারিং, নিরাপত্তা এবং স্কেলযোগ্য কম্পিউটিং সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে স্টার্টআপ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাত দ্রুত নতুন সমাধান তৈরি করতে পারবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, কৃষি, আর্থিক খাত এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে AI ব্যবহার বাড়াতে হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত ভিত্তি শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বাস্তব প্রস্তুতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভোলিউশন ন্যাশনাল পলিসি প্রণয়ন করা যেতে পারে, যেখানে উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টকে একসঙ্গে যুক্ত করা হবে। এই নীতির অধীনে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি উৎসাহিত করতে একটি ইমার্জিং টেকনোলজি অ্যাপলিকেশন ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিল্প, শিক্ষা এবং প্রযুক্তি খাতের সমন্বয়ে একটি বিশেষ 4IR ইমপ্লিমেনটেশন টাস্কফোর্স গঠন করলে নতুন প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ দ্রুত বাড়বে। এই টাস্কফোর্স শিল্প অটোমেশন, রোবোটিক্স, বায়োটেক, AI অ্যাপ্লিকেশন এবং স্মার্ট গভর্ন্যান্স সলিউশন বাস্তবায়নে কাজ করবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

খাদ্য নিরাপত্তা কেবল উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি সংরক্ষণ, পরিবহন ও ন্যায্য বাজার ব্যবস্থার প্রশ্ন। জেলা পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষকদের সরাসরি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে যুক্ত করা গেলে অপচয় কমবে। জলবায়ু সহনশীল বীজ ও স্মার্ট সেচ প্রযুক্তিতে ভর্তুকি দিলে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়ে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হয়।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি। “লার্নিং রিকভারি প্রোগ্রাম” চালু করে গণিত, বিজ্ঞান ও ভাষায় শিক্ষার্থীদের দক্ষতা মূল্যায়ন করে দুর্বল অঞ্চলে বিশেষ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে শিল্পখাতের সঙ্গে যুক্ত করে কারিকুলাম হালনাগাদ করলে তরুণদের কর্মসংস্থান সম্ভাবনা বাড়বে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়নই প্রধান হাতিয়ার।
জ্বালানি খাতে স্বচ্ছ নিরীক্ষা প্রকাশ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা হালনাগাদ না করলে অর্থনীতি অস্থির থাকবে। জ্বালানি নীতিতে স্বচ্ছতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রবাসী আয়ের প্রণোদনা কাঠামো উন্নত করা হলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা সময়ের দাবি।

বিশেষ করে Association of Southeast Asian Nations (আসিয়ান) দেশগুলো দ্রুত বর্ধনশীল বাজার। এই অঞ্চলে রপ্তানি বাড়াতে শুল্ক সুবিধা, মান নিয়ন্ত্রণ সনদ ও লজিস্টিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। তৈরি পোশাক, ওষুধ, আইটি সেবা ও কৃষিপণ্য—এই খাতগুলোতে আমরা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারি।

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে হালাল খাদ্য উৎপাদনে স্বাভাবিক সুবিধা রাখে। বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতি ইতোমধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে। হালাল সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাজার সম্প্রসারণ করলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। হালাল কসমেটিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস ও পর্যটনও এই অর্থনীতির অংশ হতে পারে।

প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া এই সব উদ্যোগের সাফল্য টেকসই হবে না। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং পদোন্নতিতে মেধাভিত্তিক নীতি অনুসরণ আস্থা বাড়াবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থায় মামলার জট কমাতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ, শ্রমবাজারের মর্যাদা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য স্কিলড মাইগ্রেশন একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশের একটি বড় অংশের প্রবাসী কর্মী নিম্ন বা মধ্য-দক্ষতার কাজে নিয়োজিত, যার ফলে ব্যক্তি আয় সীমিত থাকে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের গুণগত মানও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায় না। অথচ বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে—বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, আইটি, সেমিকন্ডাক্টর সাপোর্ট সার্ভিস, এনার্জি টেকনিশিয়ান, অটোমেশন অপারেশন, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কেয়ার ইকোনমি সেক্টরে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। প্রথম ১২০ দিনের মধ্যেই একটি ন্যাশনাল স্কিলড মাইগ্রেশন রোডম্যাপ তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারভিত্তিক স্কিল ম্যাপিং, দেশভিত্তিক স্কিল স্ট্যান্ডার্ড অ্যালাইনমেন্ট এবং গ্লোবাল সার্টিফিকেশন ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করা হবে।

সরকার যদি টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, মেডিকেল টেকনিক্যাল স্কিল সেন্টার, আইটি স্কিল একাডেমি এবং ইন্ডাস্ট্রি-লিঙ্কড ভোকেশনাল সিস্টেমকে একীভূত করে “এক্সপোর্ট-ওরিয়েন্টেড স্কিল পাইপলাইন” তৈরি করতে পারে, তাহলে প্রতিটি অভিবাসী কর্মীর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শ্রম চুক্তিতে শুধু কর্মসংস্থান নয়, স্কিল রিকগনিশন, সোশ্যাল সিকিউরিটি এবং ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে প্রবাসী কর্মীরা শুধু রেমিট্যান্স প্রেরণকারী হিসেবে নয়, বরং গ্লোবাল স্কিল ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। স্কিলড মাইগ্রেশনকে যদি জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ করা যায়, তাহলে রেমিট্যান্স প্রবাহ শুধু পরিমাণে নয়, মানেও উন্নত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীলতায় এটি একটি নির্ভরযোগ্য স্তম্ভে পরিণত হবে।

সবশেষে, রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ১২০ দিনেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেবে। বিভাজন নয়, সমঝোতা—এই বার্তাই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।

প্রথম ১২০ দিন কোনো জাদুকরি সমাধানের সময় নয়; কিন্তু এটি একটি শক্ত ভিত নির্মাণের সুযোগ। যদি নতুন সরকার এই সময়টিকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র, প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর এবং সাহসী কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তবে জনগণের আস্থা পুনর্গঠিত হবে। বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও দৃঢ় বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ১২০ দিনই হতে পারে একটি দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণের নতুন যাত্রাপথের সূচনা।

লেখক : সাকিফ শামীম, এফএসিএইচই, এফএলএময়াই, অর্থনীতিবিদ
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : জাতীয় নির্বাচন: নতুন সরকার গঠন করবে কে?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন