১৭/০২/২০২৬, ২২:০৬ অপরাহ্ণ
24 C
Dhaka
১৭/০২/২০২৬, ২২:০৬ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

রোজা শুরুর আগেই কিছু পণ্যের উচ্চ দামে ভোক্তার হাঁসফাঁস

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজারে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রবণতা। এক বছরের ব্যবধানে কিছু পণ্যের দাম কমলেও বেশ কয়েকটির ক্ষেত্রে বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে সার্বিকভাবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের অস্বস্তি বাড়ছে। এরই মধ্যে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণে সিন্ডিকেট নাকি সরবরাহ ঘাটতি পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে– এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে খুচরা বাজারে।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের ক্রেতাদের মুখে পুরোনো সেই কষ্টের ছাপ দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দ্রব্যমূল্যের অধিক চাপ সইতে হয়েছিল দেশবাসীকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই চাপ কিছুটা কম ছিল। গত বছর রমজানে অতি জরুরি অনেকগুলো নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় মাত্রায় নেমে এসেছিল। এবার সরকার পরিবর্তনের সুযোগে রমজানের আগ মুহূর্তে লাগামহীনভাবে ছুটছে নিত্যপণ্যের বাজার। এতে ক্রেতারা হাঁসফাঁস করছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দর ধর্মঘটের কারণে সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়া ও নির্বাচনের ছুটিতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রমজানে প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে, দাম বাড়ার সুযোগ নেই। তবুও নানা অজুহাতে বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের।

রোজায় চাহিদা কতটা, জোগান কেমন

আমদানি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের মধ্যে রমজানে বেশি চাহিদা থাকে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, এঙ্কর ডাল, পেঁয়াজ, আটা ও খেজুরের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, শুধু রমজান মাসে সয়াবিন তেলের চাহিদা ৩ লাখ টন। এ ছাড়া চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন, ছোলা ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টন, মসুর ডাল ২ লাখ ৫ হাজার টন, পেঁয়াজ ৫ লাখ টন এবং খেজুরের চাহিদা ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতিটি পণ্যেরই ২৫ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি মজুত রয়েছে। অর্থাৎ সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।

বাজারে কোন পণ্যের দাম কত

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় ছোলার দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা কমে ৯০ টাকা হলেও মসুর ডাল ও এঙ্কর ডালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছর রোজার একদিন আগে (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) ছোট দানার প্রতি কেজি মসুর ডাল বিক্রি হয়েছে ১৩৫ টাকা, যা আজ (১৭ ফেব্রুয়ারি) ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর মোটা দানার মসুর ডালের দাম বছরের ব্যবধানে ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকায় উঠেছে। গত বছর এঙ্কর ডাল বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা কেজি দরে, যা এ বছর ১১০ থেকে ১২০ টাকা হচ্ছে।

বছরের ব্যবধানে রোজার ঠিক আগ মুহূর্তে আটা, সয়াবিন তেল ও পেঁয়াজের দামও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। গত বছর রমজানের আগে দুই কেজির প্যাকেট আটা বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকায়, এ বছর যা ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সয়াবিন তেলের দাম বছরের ব্যবধানে বেড়ে প্রতি লিটার ১৭৫ টাকা থেকে ১৯৫ টাকা হয়েছে। আর গত বছর রোজার একদিন আগে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজের দাম এবার রোজা শুরুর আগেই ৬০ টাকা হয়েছে। তবে প্রতি কেজি আলু এ বছর গতবারের দামে অর্থাৎ ২০ থেকে ২৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

বছরের ব্যবধানে যেসব পণ্যে স্বস্তি

বছরের ব্যবধানে চিনি, রসুন, ডিম, ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। গত বছর রোজার একদিন আগে ১২০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হওয়া চিনি এ বছর ১০০ থেকে ১১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি দেশি রসুন ১৫০ টাকা থেকে কমে ১২০ টাকায় ও ডিমের ডজন ১৪০ থেকে কমে ১২০ টাকায় নেমেছে।

গুরুত্বপূর্ণ কাঁচাপণ্যের দাম কেমন

প্রতি বছর রোজার আগে বেগুন, লেবু ও কাঁচামরিচের দামে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাজারে বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের বেগুনের দামও। গোল বেগুন (কালো) বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। গত বছর রমজান শুরুর একদিন আগে যা ৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। আর গত বছর কালো লম্বা বেগুন ও সাদা গোল বেগুন ৫০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও এবার তা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে, লেবুর হালি এবারও রোজ শুরুর আগে হঠাৎ কয়েকদিনের ব্যবধানে ২০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকায় উঠেছে। বর্তমানে বাজারে এক হালি বড় সাইজের লেবু ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরও রোজার একদিন আগে ৮০-১০০ টাকায় লেবুর হালি বিক্রি হয়েছিল। গত বছর রোজার শুরুতে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। আজ রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে তা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে মুগদা বাজারে সবজি কিনতে আসা মোজাম্মেল মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভোটের জন্য সরকারের বাজারে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যবসায়ীরা মাঝে কিছুদিন বলেছে ভোটের জন্য গাড়ি আসে না, সেজন্য বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এখন তো গাড়ি আসার সমস্যা নেই। এখন কেন দাম বাড়ছে। প্রতি বছর রোজার আগে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে, এই সহজ বিষয়টি বুঝেও কেন সরকার সময়মতো গুরুত্ব দেয় না, সেটিই আমরা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারি না।

মুরগি-গরুর মাংসেও দাম বেড়েছে

এক বছর আগে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগি এখনো ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অবশ্য গত দুই সপ্তাহ আগেও ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। ব্রয়লার মুরগির পাশাপাশি সোনালীর দাম বেড়েছে বছরের ব্যবধানে ২০ টাকা পর্যন্ত। গত বছর ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হওয়া সোনালী মুরগি এবার রোজা শুরুর আগেই ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর গরুর মাংসের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়, যা গত বছর রোজার আগে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় পাওয়া যেত। তবে খাসির মাংস প্রতি কেজি গত বছরের দামে অর্থাৎ ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

শুল্ক কমার পরও খেজুরের দাম আকাশছোঁয়া

রোজায় খেজুরের দাম কমাতে গত বছরের মতো এবারও শুল্কহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহেও ঘাটতি নেই। তা সত্ত্বেও গত বছরের তুলনায় বিভিন্ন ধরনের খেজুরের দাম এবার বেশি দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া খেজুর জাহিদী প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। গত বছর রোজা শুরুর একদিন আগে যা ২৩০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কেজি জাহিদী খেজুরের দাম বছরের ব্যবধানে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে বস্তা খেজুর, যা প্রতি কেজি ২২০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি দাবাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকা, বড়ই ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব খেজুরের দামও কিছুটা বেড়েছে।

এ বিষয়ে কারওয়ান বাজারের পাইকারি ও খুচরা খেজুর বিক্রেতা আরাফাত হোসেন বলেন, হঠাৎ করে জাহিদী খেজুর ১০ কেজির প্যাকেটে ৬০০ টাকা দাম বেড়েছে। দাবাসে বেড়েছে ৪০০ টাকা। বন্দরে খেজুর আটকে ছিল, এ কারণে সরবরাহ কমে গেছে। প্রায় সব ধরনের খেজুরেই গত এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী

বিশ্লেষকরা মনে করেন, রমজানে বাজার দর স্বাভাবিক রাখতে সরকারের দ্রুত নজর দেওয়া উচিত। জাতীয় নির্বাচনের জন্য বাজার দরে যে ব্যত্যয় ঘটেছে, তা দ্রুত সংশোধন না করলে রমজান মাসে ভোক্তাকে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।

এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রোজার পণ্যের উৎপাদন ও আমদানি চাহিদার তুলনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ আছে। তবে এবার নির্বাচনের কারণে বাজারজাতকরণে ব্যত্যয় হয়েছে। এজন্য আগামী কয়েকদিন কারখানা বা গুদাম থেকে রোজার পণ্য বাজারজাতকরণে বিশেষ নজর রাখা দরকার। তাহলে মূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা ও যথাযথ বাজার মনিটরিং করা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে বলে মনে করেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই ফল ও নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার মনিটরিং যথাযথ না হলে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। আমদানি সহজীকরণ, পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা এবং পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত নজরদারি জোরদার না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।

পড়ুন:এলপি গ্যাসের ওপর ভ্যাট কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

দেখুন:মাদারীপুরে ঘরের তালা ভেঙে বৃদ্ধার ঘরে যা দেখলো পুলিশ | 

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন