১৭/০২/২০২৬, ২৩:১৮ অপরাহ্ণ
24 C
Dhaka
১৭/০২/২০২৬, ২৩:১৮ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

খালেকদাদ চৌধুরী: তারুণ্যের মানসপটে সাহিত্যের বীজবপনকারী

নেত্রকোনার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে খ্যাতিমান বাংলাদেশী প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, লোকসাহিত্যের সংগ্রাহক, পত্রিকার সম্পাদক ও একজন রাজনীতিবিদ এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত খালেকদাদ চৌধুরী কেবল একটি নাম নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান এবং একটি যুগের নির্মাতা।

বিজ্ঞাপন

নেত্রকোনা পৌর শহরের মোক্তারপাড়াস্থ বকুলতলায় আয়োজিত ‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার-১৪৩২’ প্রদান অনুষ্ঠানে পিতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলেন খালেকদাদ চৌধুরীর পুত্র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী।

বসন্ত উৎসব ও সাহিত্য আয়োজনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি নেত্রকোনার সাহিত্য আন্দোলন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হায়দার জাহান চৌধুরী বলেন, ষাটের দশকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে খালেকদাদ চৌধুরী যখন নেত্রকোনায় ফেরেন, তখন তিনি অবসর জীবন যাপনের বদলে বেছে নিয়েছিলেন সমাজ ও সংস্কৃতি পুনর্গঠনের এক নতুন লড়াই। কলকাতা জীবনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা এবং কবি নজরুলের সান্নিধ্যে দেখা বাংলা সাহিত্যের রেনেসাঁসের স্বপ্ন তিনি এই জনপদে বুনে দিতে চেয়েছিলেন। আর এই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ‘সাধারণ গ্রন্থাগার’।

তিনি বলেন, “বাবা বিশ্বাস করতেন, লাইব্রেরি কেবল বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, এটি একটি বাতিঘর। তিনি চেয়েছিলেন এই গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র করে তরুণ সমাজের মধ্যে সাহিত্যের বীজ রোপণ করতে।”

খালেকদাদ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘উত্তর আকাশ’ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এটি কেবল একটি সাময়িকী ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন উদীয়মান লেখকদের আত্মপ্রকাশের এক শক্তিশালী মঞ্চ। স্কুল-কলেজের নবীন লেখকদের লেখা শুধরে দেওয়া, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের উৎসাহিত করার মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল সাহিত্যিক বলয়।

বক্তব্যে নেত্রকোনার সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের কথা উঠে আসে। হায়দার জাহান চৌধুরী জানান, খালেকদাদ চৌধুরী এবং সাধারণ গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্যিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল, সেখান থেকেই উঠে এসেছেন যতীন সরকার, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ ও রফিক আজাদের মতো বরেণ্য কবি ও সাহিত্যিকরা।

তিনি আরও বলেন, “হুমায়ূন আহমেদ থেকে শুরু করে মুহম্মদ জাফর ইকবাল- প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে এই উর্বর মাটির সন্তান। বাবার সেই প্রচেষ্টা নেত্রকোনার সাহিত্যকে কেবল স্থানীয় গণ্ডিতে আটকে রাখেনি, পৌঁছে দিয়েছে জাতীয় পর্যায়ে।”

নেত্রকোনা কেবল সাহিত্যের চারণভূমি নয়, এটি শৌর্য-বীর্য ও বিদ্রোহের এক ঐতিহাসিক জনপদ- এমন মন্তব্য করে হায়দার জাহান চৌধুরী এ অঞ্চলের লড়াকু ইতিহাসের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে টিপু পাগলের নেতৃত্বে এখানকার তেজোদীপ্ত কৃষকরা যে সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ে তুলেছিল, তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশদের ‘নাটোরকোনায়’ পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করতে হয়েছিল।

তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন ‘ঈশা খাঁ’র তলোয়ারের ঝলকানি, যা মোগল আধিপত্য রুখে দিয়েছিল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি ধাপে নেত্রকোনার অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে হায়দার জাহান চৌধুরী বর্তমান প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আজকের এই ‘বসন্ত উৎসব’ কিংবা ‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার’- সবই সেই মহান উত্তরাধিকারের অংশ। আমাদের পূর্বসূরীরা যে মশাল জ্বালিয়ে গেছেন, তা জিইয়ে রাখার দায়িত্ব এখন আমাদের সকলের।”

নেত্রকোনার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, নেত্রকোনার সাহিত্যাকাশে যে নক্ষত্ররা জ্বলজ্বল করছেন, তাদের আলোয় আলোকিত হবে আগামীর পথচলা।

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক কবি তানভীর জাহান চৌধুরীর সঞ্চালনায় এ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সভাপতি ম. কিবরিয়া চৌধুরী।

প্রধান হিসেবে বক্তব্য রাখেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, কবি এ.বি.এম সোহেল রশিদ, মরহুম খাদেকদাদ চৌধুরীর ছেলে বীরমুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, প্রফেসর ননী গোপাল সরকার, কবি ও অভিনেত্রী সোনিয়া জাহান স্বপ্ন প্রমুখ।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রাফিকুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুখময় সরকার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান, সাহিত্য সমাজের সহ-সভাপতি কবি এনামুল হক পলাশসহ কবি-সাহিত্যিকে এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যক্তিবর্গ ও অনুরাগীরা।

‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার-১৪৩২’ প্রদান অনুষ্ঠানে গুণী দুজনের একজন উপস্থিত থেকে প্রধান অতিথির কাছ থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেন আব্দুল্লাহ আল মাসুম। আরেকজন আবদুল হাই শিকদার গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে আসতে না পারায় তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার নেত্রকোনা প্রতিনিধি কামাল হোসাইন।

পড়ুন:মেয়ে রাশাকে নিয়ে বিতর্ক, স্পষ্ট অবস্থানে রাভিনা

দেখুন:মাদারীপুরে ঘরের তালা ভেঙে বৃদ্ধার ঘরে যা দেখলো পুলিশ | 

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন