আবারও ফিরে এসেছে বছরের সেরা মাস—পবিত্র রমজান। মহান আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া, তিনি আমাদেরকে আরও একবার তার অগণিত রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের এই মহিমান্বিত মাসে উপনীত হওয়ার তাওফিক দান করেছেন। রমজান মহান আল্লাহর এক অফুরন্ত রহমতের মহাসাগর; যে সৌভাগ্যবান বান্দা এই সাগরে নিমজ্জিত থেকে সত্য সন্ধানের চেষ্টা করে সে অর্জন করতে পারে অমূল্য মণি-মুক্তা—ক্ষমা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য।
রমজান: প্রস্তুতির মাস
খোদার রহমতের এই মহাসাগর থেকে প্রকৃত উপকার লাভ করতে হলে প্রয়োজন যোগ্যতা অর্জন। ইহকাল ও পরকাল মিলিয়ে যে অনন্ত জীবন, তার পাথেয় সংগ্রহের সর্বোত্তম সুযোগ রমজান। তাই এই মাসে জ্ঞানার্জন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও আত্মসমালোচনার বিকল্প নেই। আমরা যেন ইসলামি বর্ণনা ও শিক্ষার আলোকে আত্ম-সংশোধন, আত্ম-গঠন ও আত্ম-উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারি—এটাই হোক প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত প্রার্থনা।
রমজান: খোদাপ্রেমের প্রশিক্ষণ
রমজান মূলত মহান আল্লাহর প্রেমে বিভোর হওয়ার প্রশিক্ষণের মাস। প্রকৃত মুমিন কেবল জান্নাতের আশায় বা জাহান্নামের ভয়ে ইবাদত করেন না; তিনি ইবাদত করেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য। রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হলো এই গভীর খোদাভীতি (তাকওয়া) ও খোদাপ্রেম অর্জন করা। যে হৃদয় সর্বক্ষণ আল্লাহর স্মরণে ব্যাকুল, সেখানে পার্থিব লোভ কিংবা পরকালীন প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাও গৌণ হয়ে যায়। সে মন অন্যায়, ভয় ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহমুখী হয়ে ওঠে।
রোজার সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব
রোজার বাহ্যিক একটি বড় উপকার হলো—এটি মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা জাগ্রত করে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করে মানুষ গরিব-দুঃখী ও নিঃস্বদের দুঃখ উপলব্ধি করতে শেখে। ফলে সমাজে দান, সহানুভূতি ও মানবিকতার চর্চা বাড়ে। ‘রমজান’ শব্দটির শাব্দিক অর্থ দাহন বা পুড়িয়ে ফেলা। অর্থাৎ এই মাসে মানুষের অন্তরের কুপ্রবৃত্তিগুলোকে দহন করা হয়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অহংকার ও হিংসা—এসব নফসের প্রবৃত্তি মানুষের আত্মাকে কলুষিত করে। রোজা সেই কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। যেমন আগুনে পুড়ে সোনা খাঁটি হয়, তেমনি সংযমের সাধনায় মানুষও হয় নির্মল।
কুরআনের আলোকে রোজা
পবিত্র কুরআনের কুরআন-এর সূরা আল-বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (২:১৮৩)
এরপরের আয়াতগুলোতে অসুস্থ ও মুসাফিরদের জন্য রোজা কাযা করার বিধান, দরিদ্রকে খাদ্যদানের কথা এবং রমজান মাসে কুরআন নাযিলের ঘোষণা এসেছে। রমজান কেবল রোজার মাস নয়; এটি হেদায়েতের মাস, আত্ম-সংযমের মাস, কৃতজ্ঞতার মাস।
সূরা আল-বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে রোজার সময়সীমা, পারিবারিক জীবনের বিধান ও ইতেকাফের নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে—আল্লাহ বান্দার জন্য সহজ চান, কষ্ট চান না। অর্থাৎ রোজা কঠোরতা নয়; এটি ভারসাম্যপূর্ণ সংযমের শিক্ষা।
রোজার শিক্ষা
রমজান কেবল খাদ্য ও পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি আত্মার জাগরণ, অন্তরের পরিশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের মাস। এই মাস আমাদের শেখায়—
- সংযম
- সহমর্মিতা
- আত্মসমালোচনা
- আল্লাহমুখী জীবন
তাই প্রতিটি মুসলমানের রমজানকে কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও আত্মউন্নয়নের এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মাসের পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
পড়ুন: লাল পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন ড. ইউনূস
আর/


