দেশের কর্পোরেট ও শিক্ষাখাতে আলোচিত ও বিতর্কিত নাম কৃষিবিদ গ্রুপ এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আফজালের বিরুদ্ধে শিক্ষায় প্রতারণা, জমি দখল ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক গোয়েন্দা তদন্ত, গণমাধ্যম প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে উঠে এসেছে—এই প্রতিষ্ঠানের ছায়াতলে চলছে ভূমি দখল, প্রতারণা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, জাল দলিল তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের এক বিস্তৃত সিন্ডিকেট।
কৃষিবিদ গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা, কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে দেশের স্বনামধন্য একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তাকে দিনের আলোয় তুলে নিয়ে বেধড়ক মারধর করে ফেলে রাখে কৃষিবিদ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলায় ব্যবহৃত গাড়িগুলোর একটি কৃষিবিদ গ্রুপের মালিকানাধীন।
এ ছাড়া, কৃষিবিদ গ্রুপের অধীনস্থ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ প্রতারণা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েক মাস বেতন পরিশোধের পর তা বন্ধ করে দেওয়া, চাকরি ছাড়লে বকেয়া আটকে রাখা, এমনকি হুমকি-ধমকিও নতুন নয়। ভুক্তভোগী সাবেক অধ্যক্ষ জোবায়ের হাসান জানান, তিনি ১৩ লাখ টাকারও বেশি বকেয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই অভিযোগ করেছেন আরও বহু শিক্ষক।
বন বিভাগের জমি বেচাকেনায় জালিয়াতি
বন বিভাগের মালিকানাধীন জমি জাল দলিলের মাধ্যমে বিক্রি ও ক্রয়ের অভিযোগে ২০২১ সালে কালিয়াকৈর রেঞ্জ অফিসার শহীদুল আলম আদালতে মামলা দায়ের করেন কৃষিবিদ সিটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে। ওই মামলার মূল অভিযুক্ত আলী আফজাল ও তার সহযোগীরা রাষ্ট্রীয় জমি নিজেদের দখলে নিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত। মামলার পর বাদীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। প্রশাসনের উদাসীনতায় এটা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এছাড়া সাভার ও আশপাশের এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে কৃষিবিদ গ্রুপের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—রাতের আঁধারে গাছ কেটে জমি সমান করে নেওয়া হয়, জমির মালিকদের প্রবেশ করতেও দেওয়া হয় না।
পুঁজিবাজারে প্রতারণা ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাস
কৃষিবিদ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কৃষিবিদ ফিড লিমিটেড ২০২১ সালে বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে মুনাফা অতিরঞ্জিত দেখানোর মাধ্যমে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অযোগ্য ঘোষিত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে রিপোর্ট করিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা হয়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়—‘এটি সরাসরি অর্থনৈতিক সন্ত্রাস।’
রাজনৈতিক ছদ্মবেশে প্রভাব বিস্তার
বিশ্লেষকরা বলছেন, আলী আফজাল বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পরিচয় পাল্টে প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোল। আগস্টের অভ্যুত্থানের পর জামায়াতে ইসলামের নাম ব্যবহার করে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এই রাজনৈতিক রঙ বদলের প্রবণতা শুধু নৈতিক অধঃপতনেরই প্রতিফলন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অপরাধচক্রের প্রভাব বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত। তবে তিনি সুবিধা করতে পারেননি। তার অপকর্মের তথ্য পাওয়ায় জামায়াতে ইসলামী তাকে তাদের কাছে না ভেড়ার অনুরোধ জানায়।
এই চক্র তাদের প্রতিপক্ষ ও বিভিন্ন সৎ উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা, বানোয়াট মামলা ও সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয় করার কৌশল হাতে নিয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের বিচ্ছিন্ন করে ব্যবসা-সম্পদ দখলের পাঁয়তারা করে তারা। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অসাধু রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেট নিজেদের রক্ষা করতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করছে।
এই প্রতিবেদন প্রস্তুতিকালে কৃষিবিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আফজালের মন্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষক, মানবাধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন—একজন ব্যক্তি কীভাবে কখনো ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থেকে, আবার কখনো ধর্মীয় দলের নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাস, প্রতারণা ও ভূমি দখলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে—তা রাষ্ট্রীয়ভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। তাদের অভিযোগ, এই মাফিয়া চক্র শিক্ষা, ব্যবসা ও প্রশাসনের ওপর এক সর্বগ্রাসী থাবা বসাতে চায়, যা দেশের নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য এক ভয়ংকর হুমকি।
পড়ুন: সচিবালয়ে দ্বিতীয় দিনে অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
আর/


