ঢাকাসহ দেশের একটা বড় অংশে পাইপলাইনের গ্যাসের প্রচণ্ড স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না। কোথাও আবার অল্প আঁচে টিমটিম করে জ্বললেও রান্না করতে লাগছে দ্বিগুণ সময়। এই সংকটের মধ্যেই বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। সেখানেও চলছে নৈরাজ্য। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার সময় তিন ঘণ্টা বাড়িয়েছে জ্বালানি বিভাগ। পাশাপাশি নতুন সরকার সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি খাতে ১০০ দিন এবং পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে জানা যায়, গ্যাসের স্বল্পচাপের মূল কারণ হলো সরবরাহ কম। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে বিদ্যুতে কম পড়ে। বিদ্যুতে দিলে আবাসিকে টান পড়ে। দেশে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয় ২৬০ কোটি ঘনফুট। উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া গ্যাসের ঘাটতি মেটানোর আর কোনো উপায় নেই।
পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার এলপিজির দিকে ঝুঁকছে। সেখানেও চলছে বিশৃঙ্খলা। জানুয়ারি মাসজুড়ে সারাদেশে সিলিন্ডার গ্যাসের তীব্র সংকট ছিল। এখন তা খানিকটা কমলেও দামের নৈরাজ্য রয়ে গেছে।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১২ কেজির সিলিন্ডার ২৪০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। গত সোমবার সেটি ১৮০০ টাকা নিয়েছে। যদিও সরকার নির্ধারিত দাম ১৩০৬ টাকা।
জানুয়ারিতে এক লাখ ৬৭ হাজার টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করেছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। বাস্তবে এসেছে এক লাখ পাঁচ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ ৮৪ হাজার টন আমদানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চালকরা চাহিদার অর্ধেক গ্যাস পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানীর মগবাজার, মহাখালী, রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর বাইরে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। পাম্প মালিকরা জানান, কমপ্রেসার চালু রেখেও পর্যাপ্ত গ্যাস তোলা যাচ্ছে না। এতে একদিকে গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে ফিলিং স্টেশনগুলো। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা। অনেক ক্ষেত্রেই সিলিন্ডার অর্ধেক খালি রেখেই ফিলিং স্টেশন ছাড়তে হচ্ছে। দিনের মধ্যে একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতেও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন। তাতে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
রমজানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে সিএনজি স্টেশন প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ১৪ মার্চ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। আগে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকত।
গতকাল শুক্রবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কে স্বল্প চাপ পরিস্থিতি নিরসন এবং রমজানে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বাড়তি চাহিদা পূরণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে ১৫ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সিএনজি ফিলিং স্টেশন সার্বক্ষণিক খোলা রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২৬ মার্চ থেকে আবার আগের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকবে।
দেশের সরবরাহ করা গ্যাসের ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়। তাও এ খাতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। শীত বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। রমজান শুরু হয়েছে। সঙ্গে চলছে সেচ মৌসুম। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ছে। তবে এপ্রিল থেকে জুনে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এপ্রিল-মে মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তখন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল। এবার একই সময়ে চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট দিতে পারবে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং ভোগাতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, আমদানি বাড়ানো হবে, তাই দাম বাড়ানো দরকার। দাম বাড়িয়ে আমদানি আর বাড়াতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ৩৩ শতাংশ। এরপর আমদানি সামান্য বাড়ালেও সংকট কাটেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সদ্য ক্ষমতায় বসা বিএনপি সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি মোকাবিলা করা। এ বিষয়ে শামসুল আলম বলেন, নতুন সরকারকে আমদানি থেকে নজর ফেরাতে হবে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে নজর দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

