দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চলের চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা বিরামপুর, হাকিমপুর, ঘোড়াঘাট ও নবাবগঞ্জ নিয়ে বিরামপুরকে পৃথক জেলা ঘোষণার দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের এই দাবি এখন চার উপজেলার মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, পেশাজীবী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারা একযোগে এই দাবি জানিয়ে আসছেন।
চার উপজেলায় মিলিয়ে প্রায় সাত লাখ মানুষের বসবাস। অথচ প্রশাসনিক নানা কাজের জন্য জেলা সদর দিনাজপুরে যেতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে সময়, অর্থ ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, দক্ষিণাঞ্চলের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক জেলা গঠন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন বলেন,বিরামপুরকে জেলা করার দাবি নতুন নয়। বহু বছর ধরে আমরা এই দাবি জানিয়ে আসছি। জেলা হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি প্রশাসনিক সেবা পাবে এবং দুর্ভোগ কমবে।
ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন খাঁন বলেন,হিলি স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর। এই বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারব্যবস্থা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। জেলা হলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শিক্ষক মাহবুব হোসেন বলেন,প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিরামপুর জেলা হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। চার উপজেলার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ দ্রুত সরকারি সেবা পাবে।
স্থানীয়দের দাবি, অতীতে বিরামপুরকে মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষ কাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। তাদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনায় বিরামপুরকে জেলা ঘোষণা করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে।
ব্যবসায়ীক হাফিজুর রহমান বলেন, জেলা হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সরকারি দপ্তর স্থাপন এবং শিল্প-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে। ঘোড়াঘাট থেকে দিনাজপুর জেলা সদরে যেতে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার রাস্তার পাড়ি দিতে হয়। কোনো কাগজ বা সনদ নিতে গেলেই পুরো একটি দিন সময় লেগে যায়। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয় এবং সাধারণ মানুষকে চরম কষ্ট সহ্য করতে হয়।
দিনাজপুর দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়ন ফোরাম দিদউফ সাধারণ সম্পাদক মোজ্জাম্মেল হক বলেন, চার উপজেলার সমন্বয়ে পৃথক জেলা গঠন হলে প্রশাসনিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা পাবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
বিরামপুর পেশাজীবী ঐক্য ফ্রন্ট আহবায়ক রফিকুল ইসলাম বলেন,এটি কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি বাস্তবে প্রয়োজন।
গণমাধ্যমকর্মী ও পেশাজীবী ঐক্য ফ্রন্ট বিরামপুরের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মাহমুদুল হক মানিক বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে বিরামপুরে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরো জানান, বর্তমান মন্ত্রী এই এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের আশ্বাসও দিয়েছেন।তিনি আরও বলেন,তিনি আমাদের এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং এখন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা আশা করি, তিনি তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি বিরামপুরকে জেলা ঘোষণা করা হোক।
এ বিষয়ে স্থানীয়রা মন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে ,ইতিপূর্বে অনেক সরকার ক্ষমতায় এসে শুধু আশ্বাস দিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্ববে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এবার আমরা আশা করি, বর্তমান মন্ত্রী আমাদের এই দীর্ঘদিনের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং বিরামপুরকে জেলা ঘোষণা করবেন।
এলাকাবাসী জানান, তারা দিনাজপুর আসনের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দাবি উপস্থাপন করেছেন। এখন চার উপজেলার মানুষের প্রত্যাশা আর শুধু আশ্বাস নয়, এবার বাস্তবায়ন।
চার উপজেলার মানুষের বিশ্বাস, বিরামপুরকে জেলা ঘোষণা করা হলে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।
পড়ুন : পাঁচবিবিতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নাম থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ উধাও


