ভারতে গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই চলছে। কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপের ২০২১ সালের গোপনীয়তা নীতি। বিষয়টি এখন শুনানিতে আছে সুপ্রিম কোর্ট অব ইন্ডিয়াতে।
বিজ্ঞাপন
এই মামলায় প্রশ্ন উঠেছে, প্রভাবশালী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের তথ্য কত দূর পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবে এবং ব্যবহারকারীর সম্মতি আদায়ের পদ্ধতি কতটা ন্যায্য।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে হোয়াটসঅ্যাপ নীতিমালায় পরিবর্তন আনে। নতুন শর্তে বলা হয়, অ্যাপ ব্যবহার চালিয়ে যেতে হলে ব্যবহারকারীদের তথ্য মূল প্রতিষ্ঠান মেটা–এর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগিতে সম্মতি দিতে হবে। সমালোচকেরা একে ‘নাও অথবা ছেড়ে দাও’ ধরনের শর্ত হিসেবে আখ্যা দেন।
এর আগে ২০১৬ সালের নীতিতে পুরোনো ব্যবহারকারীরা বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। নতুন নীতিতে সেই বিকল্প আর রাখা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। অনেক ব্যবহারকারী জানান, অনিচ্ছা সত্ত্বেও শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ডিজিটাল অধিকার কর্মীদের ভাষ্য, এ ধরনের নীতি ব্যবহারকারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার খর্ব করে। অন্যদিকে প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলেন, বিজ্ঞাপননির্ভর ব্যবসা পদ্ধতি ইন্টারনেটভিত্তিক সেবার সাধারণ বাস্তবতা।
২০২১ সালের মার্চে ভারতের প্রতিযোগিতা কমিশন তদন্তের নির্দেশ দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল, হোয়াটসঅ্যাপ বাজারে প্রভাবশালী অবস্থান ব্যবহার করে তথ্য ভাগাভাগিতে ব্যবহারকারীদের বাধ্য করছে। এতে প্রতিযোগিতাবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে কমিশন মেটাকে ২৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে। পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য ব্যবহারকারীর তথ্য মেটার অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। নীতিমালায় তথ্য ব্যবহারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে উল্লেখ করার নির্দেশও দেওয়া হয়।
মেটা ও হোয়াটসঅ্যাপ সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার পর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়।
শুনানির সময় সর্বোচ্চ আদালত ‘নাও অথবা ছেড়ে দাও’ পদ্ধতির সমালোচনা করে। বিচারপতিরা বলেন, ব্যক্তিগত তথ্যের প্রশ্নে সংবিধানপ্রদত্ত গোপনীয়তার অধিকারকে খাটো করা যাবে না। আদালত সম্মতিভিত্তিক কাঠামো তৈরির নির্দেশ দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে হোয়াটসঅ্যাপ হলফনামা দিয়ে জানায়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহারকারীদের তথ্য ভাগাভাগির বিষয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হবে। কেউ চাইলে বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি থেকে সরে যেতে পারবেন এবং তবুও সেবা ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারবেন।
কোম্পানির দাবি, ব্যক্তিগত বার্তা প্রান্ত থেকে প্রান্ত এনক্রিপশন ব্যবস্থায় সুরক্ষিত থাকে। ভবিষ্যতের নীতিমালাও আদালতের নির্দেশনা মেনে প্রণয়ন করা হবে।
ভারতে হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহারকারী প্রায় ৮৫ কোটির বেশি। জনপ্রিয়তায় এটি শীর্ষে। বিকল্প হিসেবে সিগনাল ও টেলিগ্রাম থাকলেও ব্যবহারকারীর সংখ্যায় তারা অনেক পিছিয়ে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই মামলার রায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নীতির প্রশ্ন নয়। এটি নির্ধারণ করতে পারে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করবে এবং বিজ্ঞাপনভিত্তিক আয় কতটা নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসবে।
একাংশের মত, বিপুল ব্যবহারকারীভিত্তি থাকা প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অন্য পক্ষের যুক্তি, বিজ্ঞাপন একটি বৈধ ব্যবসা পদ্ধতি এবং ব্যবহারকারীরা চাইলে বিকল্প সেবা বেছে নিতে পারেন।
চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি। তবে এই মামলা ভারতের ডিজিটাল অধিকার, গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পড়ুন:লীড মার্কেটিং বিডির শুভেচ্ছাদূত হলেন মুনমুন
দেখুন:টিভি অভিনয়শিল্পীদের কার কত পারিশ্রমিক?
ইমি/


