মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শুরু হওয়া সংঘাত ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র–কে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে হামলা–পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বহু। সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উভয় পক্ষ থেকেই যুদ্ধের গতি বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব রাজনীতির এক অস্থির অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব শুধু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথকেও বদলে দিতে পারে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপরও এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এমনিতেই একটি ভঙ্গুর সময় পার করছে। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, রেমিট্যান্স প্রবাহ, বিমান পরিবহন এবং শেয়ারবাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ডলারের দাম বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরান–এর সংঘাত তীব্র হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও রান্নার গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে দেশে গ্যাস সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়েই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ৮২ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব বিশ্ব ভোক্তা বাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে গত বুধবার এক জরুরি পর্যালোচনাসভা হয়। দেশের অভ্যন্তরে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে বা সরবরাহ সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ ও সারের উৎপাদন কিছুটা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানানো হয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার সাশ্রয় করার আহবান জানিয়ে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এদিকে, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল (অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল) ও গ্যাস বিক্রির পাম্পগুলোতে যানবাহনের ভিড় ও দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক জায়গায় যানবাহনের সারি রাস্তায় ছড়িয়ে গেছে। কিছু পাম্পে আবার জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।পাম্পগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহে স্বল্পতার কারণেই কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। কিছু জায়গায় জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও পাওয়া গেছে।
পড়ুন: টানা তৃতীয়বার সেমিতে মুখোমুখি ভারত–ইংল্যান্ড, ইতিহাস কার পক্ষে?
আর/


