বিজ্ঞাপন

অস্ত্র কোম্পানির বিষে বিপন্ন কৃষি : নেত্রকোনার সংলাপে জলবায়ু সুবিচারের দাবি

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় হাওর অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব ও স্থানীয় জ্ঞানকে জাতীয় জলবায়ু নীতিতে (এনডিসি এবং ন্যাপ) অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী, গবেষক ও স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। একইসঙ্গে কৃষিতে বহুজাতিক কোম্পানির রাসায়নিক আগ্রাসন বন্ধ করে কৃষককেন্দ্রিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে নেত্রকোনার লেডিস ক্লাবে ‘জলবায়ু সংকট ও হাওর অঞ্চলের স্থানীয় অভিযোজন বিষয়ক নাগরিক সংলাপ’ এ বক্তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) এবং অক্সফাম যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।

চন্দ্রনাথ ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং বারসিকের সহযোগী সমন্বয়কারী সংকর ম্রং এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বারসিকের গবেষণা বিভাগের পরিচালক পাভেল পার্থ।

সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন, নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামলেন্দু পাল, জেলা শিক্ষা-সংস্কৃতি-পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল কবীর সরকার এবং বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ওহিদুর রহমান।

সংলাপে মূল আলোচনায় পাভেল পার্থ কৃষিতে বহুজাতিক কোম্পানির নেতিবাচক প্রভাবের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেসব কোম্পানি যুদ্ধের অস্ত্র ও রাসায়নিক উপাদান তৈরি করেছিল, তারাই এখন কৃষিতে ব্যবহারের জন্য কীটনাশক ও বিষ তৈরি করছে। এর ফলে কৃষকদের বাধ্য করা হচ্ছে ফসলের খেতের পোকামাকড়, শামুক, ঝিনুক ও ব্যাঙ মেরে ফেলতে। এটি কেবল প্রাণবৈচিত্র্যই ধ্বংস করছে না, বরং কৃষকদের ঋণের জালে আটকে ফেলছে।

কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং ঋণের দায়ে আত্মহত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আলু, পেঁয়াজ ও অন্যান্য ফসলের চাষিরা আজ দিশেহারা। ঋণের দায়ে এবং খাবারের অভাবে রাজশাহীর মিনারুলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষকরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। অথচ কৃষকরাই মহামারি ও দুর্যোগের সময় পুরো দেশকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখেন।”

জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হাওর অঞ্চলে অসময়ে বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অথচ যারা জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী, সেই ধনী দেশগুলো ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রাখেনি। জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে দূষণকারী কোম্পানিগুলোই স্পন্সর হিসেবে থাকছে, যা এক ধরনের প্রতারণা।

সংলাপে হাওর অঞ্চলের মানুষের টিকে থাকার নিজস্ব কৌশলের প্রশংসা করা হয়। যুগ যুগ ধরে হাওরের মানুষ ‘হাটি’ (উঁচু ঢিবি) তৈরি করে, ‘আফাল’ (বড় ঢেউ) থেকে বাঁচতে বিশেষ পদ্ধতিতে বাড়িঘর রক্ষা করে এবং স্থানীয় জাতের ধান (যেমন- গোসি, রাতা, টেপি বোরো) চাষ করে প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন।

পাভেল পার্থ এবং উপস্থিত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি জানান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিদেশ থেকে চাপিয়ে দেওয়া মেগা প্রকল্প বা বাঁধ নির্মাণ নয়, বরং হাওরের মানুষের নিজস্ব ও স্থানীয় জ্ঞানকে মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারের ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ (এনডিসি) এবং ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান’ (ন্যাপ) এ স্থানীয় মানুষের মতামত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জলবায়ু তহবিলের অর্থ কনসালটেন্ট বা আমলাদের পেছনে ব্যয় না করে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়।

সংলাপে নেত্রকোনা ও মদন উপজেলার গণমাধ্যমকর্মী, গ্রিন জার্নালিজম কমিটির সদস্য, কৃষক-কৃষানি, নাগরিক সমাজ, শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী, লেখক, গবেষক এবং সংস্কৃতিকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন ও তাদের মতামত তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : জামালপুরে অসহায় রোগীদের মুখে হাসি ফোটালেন বিপুল মাস্টার

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন