ইউরোপ সেরার মঞ্চে শেষ ষোলো শেষে এবার পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, শিরোপার দৌড়ে কারা এগিয়ে এবং কোন দলগুলো এখনও নিজেদের অসম্পূর্ণতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দুই লেগের এই পর্বে বড় দলগুলোর বেশির ভাগই শুধু ফলের দিক থেকে নয়, খেলার ধরন, মানসিক দৃঢ়তা এবং কৌশলগত পরিপক্বতার দিক থেকেও নিজেদের আলাদা করেছে। কোথাও বড় ব্যবধানে জয়, কোথাও প্রথম লেগের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানো, আবার কোথাও সীমিত সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে শেষ ষোলো ছিল শক্তির বাস্তব পরীক্ষা।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণও প্রত্যাশিতপ্রত্যাবর্তনকরেছেঅলরেডরা। প্রথম লেগে গ্যালাতাসারের মাঠে হারার পর ঘরের মাঠে তাদের সামনে ছিল স্পষ্ট চাপ, শুধু জিতলেই চলবে না, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে রাখতে হবে। সেই কাজটি শুরু থেকেইকরেছেআর্নে স্লটের দল। মাঝমাঠের দখল, দুই প্রান্ত দিয়ে দ্রুত আক্রমণ এবং প্রতিপক্ষের ওপর নিরবচ্ছিন্ন চাপএই তিনটি জায়গায় লিভারপুল ছিল অনেক এগিয়ে।
ডমিনিক সোবোসলাইয়ের গোল দলকে এগিয়ে দেওয়ার পরও প্রথমার্ধে আরও বড় ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারত স্বাগতিকরা। মোহাম্মদ সালাহ পেনাল্টি থেকে গোল করতে না পারলেও সেটি ম্যাচের গতিপথ বদলাতে পারেনি। বরং দ্বিতীয়ার্ধে দেখা যায় আরও সংগঠিত ও দ্রুতগতির লিভারপুলকে। অল্প সময়ের ব্যবধানে হুগো একিতিকে ও রায়ান গ্রাভেনবার্চের গোল ম্যাচটিকে একপেশে করে দেয়। পরে সালাহর দূরপাল্লার শট থেকে গোল শুধু স্কোরলাইন নয়, ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপের এই প্রতিযোগিতায় তাঁর পঞ্চাশতম গোল লিভারপুলের আক্রমণভাগে তাঁর ধারাবাহিকতার আরেকটি প্রমাণ।সেই সাথে কেন প্রিমিয়ারলিগ বিশ্বের সেরা লীগতাও বুঝিয়েছে।
এই ম্যাচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল লিভারপুলের সুযোগ তৈরির ক্ষমতা। বল দখলেযেমন ছিল এগিয়ে থাকা, তেমনি লক্ষ্যভেদী শটের সংখ্যাও দেখিয়েছে তারা কতটা কার্যকরভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙেছে। অর্থাৎ শুধুআবেগনয়, পরিসংখ্যানও লিভারপুলের আধিপত্যের পক্ষে কথা বলছে।
বায়ার্ন মিউনিখের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও স্পষ্ট। আতালান্তার বিপক্ষে দুই লেগ মিলিয়ে দশ গোল করার অর্থ হলো দলটি শুধু সুযোগ নিচ্ছে না, প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবেও ভেঙে দিচ্ছে। হ্যারি কেইনের উপস্থিতি তাদের আক্রমণকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তাঁর দুই গোলের মধ্যে প্রথমটি পেনাল্টি হলেও দ্বিতীয় গোলটি ছিল আক্রমণ গঠনের নিখুঁত উদাহরণ। দ্রুত পাস, জায়গা তৈরি এবং নির্ভুল পরিসমাপ্তি।
বায়ার্নের শক্তি কেবল সামনের সারিতে নয়; মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে ওঠার গতি এবং রক্ষণ থেকে বল বের করে আনার শৃঙ্খলাও চোখে পড়েছে। প্রতিপক্ষের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি করে তারা এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে আতালান্তা ধীরে ধীরে নিজেদের পরিকল্পনা হারিয়ে ফেলে। হ্যারি কেইনের পঞ্চাশ গোলের মাইলফলক এই দলের আক্রমণভাগের ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বার্সেলোনার পথচলা ছিল আক্রমণনির্ভর। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি এখনতাদেরআক্রমণভাগ। আক্রমণে একাধিক খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ, দ্রুত পাস এবং বক্সের আশপাশে জায়গা তৈরির ক্ষমতা প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলছে। তবে রক্ষণভাগে এখনও অস্থিরতা রয়েছে। বড় দলের বিপক্ষে এই জায়গাটিই তাদের জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে।
সিমিওনেরশীর্ষদের সাফল্য আবারও দেখিয়েছে, নকআউট পর্বে অভিজ্ঞতার মূল্য কত বেশি। লন্ডনেফিরতি লেগেহারলেও প্রথম লেগে তৈরি করা ব্যবধান ধরে রাখার কৌশল তারা জানে। পুরো ম্যাচে তারা খুব বেশি ঝুঁকি নেয়নি, বরং প্রয়োজনীয় সময়ে খেলার গতি কমিয়েছে, সুযোগ বুঝে আক্রমণে উঠেছে এবং প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করেছে।
টটেনহামের বিদায়ও এই পর্বের একটি বড় শিক্ষা। ফিরতি লেগে জয়ের পরও প্রথম লেগের বড় হার তাদের শেষ পর্যন্ত টেনে নামিয়েছে। যা শেখায় ইউরোপ সেরা হতে হলে নকআউট পর্বে এক ম্যাচে ভালো খেলা যথেষ্ট নয়; দুই লেগেই সমান মানসিকতা ধরে রাখতে হয়।
এখন শেষ আটে যে লড়াই সামনে আসছে, সেখানে প্রতিটি জুটি হবে আলাদাপরীক্ষা। লিভারপুলের সামনে পিএসজি, যেখানে আক্রমণের বিপরীতে আক্রমণের লড়াই দেখা যেতে পারে। বায়ার্ন মিউনিখের সামনে রিয়াল মাদ্রিদ, অভিজ্ঞতা, আভিজাত্য বনাম ছন্দের এক বড় সংঘর্ষ। আরঅলস্প্যানিশকোয়ার্টারফাইনাল বার্সেলোনা ও আতলেতিকো মাদ্রিদের লড়াই হতে পারে আক্রমণ ও সংগঠিত রক্ষণভাগের দ্বৈরথ।
শেষ ষোলো শেষে একটি বিষয় পরিষ্কার—এবারের প্রতিযোগিতায় যারা এগিয়েছে, তারা সবাই নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করে এগিয়েছে। কেউ গতিতে, কেউ দক্ষতায়, কেউ অভিজ্ঞতায়। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত এই শক্তিগুলোর মধ্যে কার সামর্থ্য সবচেয়ে বেশি স্থায়ী হয়।
পড়ুন: ঈদ উপলক্ষে আফগানিস্তানে ৫ দিন হামলা করবে না পাকিস্তান
আর/


