ত্যাগের রাজনীতি নয়, বরং ভোগ আর দখলদারিত্বের নেশায় মত্ত এক পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের রাজনীতি। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি পদে মোস্তাফিজুর রহমান মাসুমের নাম ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। যাকে নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই উঠছে হাজারো প্রশ্ন, সেই বিতর্কিত মাসুমকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোয় খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোস্তাফিজুর রহমান মাসুম ও তার বড় ভাই মাহফুজুর রহমান কালামের অতীত ইতিহাস ছিল অত্যন্ত হতদরিদ্র। এক সময় নুন আনতে পান্তা ফুরাতো যে পরিবারের, আজ তারা হাজার কোটি টাকার মালিক। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই ‘আলাদিনের চেরাগ’ তারা পেয়েছেন গত এক দশকে সোনারগাঁজুড়ে চালানো ত্রাসের রাজত্ব থেকে।
চাঁদাবাজি, সরকারি জায়গা দখল, এবং সাধারণ মানুষের জমি গ্রাস করে তারা গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। তাদের এই অবিশ্বাস্য উত্থানকে স্থানীয়রা ‘অলৌকিক’ বললেও এর নেপথ্যে রয়েছে রক্তচক্ষু আর ক্ষমতার অপব্যবহার।
সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি খাস জমি ও সাধারণ মানুষের পৈতৃক ভিটেমাটি দখলের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিত মোস্তাফিজুর রহমান মাসুম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, মাসুম ও তার পালিত বাহিনী কোনো জমি পছন্দ করলেই সেখানে লাল পতাকা পুতে দেয়। এরপর শুরু হয় হয়রানি। কখনো ভয় দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে লিখে নেওয়া, আবার কখনো সরাসরি যায়গা দখল করে নেওয়া -এই ছিল মাসুমের দৈনন্দিন কাজ।
বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন খাস জমি ও বালু মহাল দখল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মোস্তাফিজুর রহমান মাসুমের আয়ের অন্যতম উৎস হলো মামলা বাণিজ্য। সোনারগাঁ থানায় তার একক আধিপত্যের কারণে নিরপরাধ মানুষকে আসামি করে হয়রানি করা তার কাছে ডাল-ভাতের মতো।
ছোটখাটো বিরোধ বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য তিনি পুলিশের ওপর প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যে মামলা দিয়ে মানুষকে ঘরছাড়া করেন। পরে সেই মামলা থেকে নাম কাটার বিনিময়ে হাতিয়ে নেন লক্ষ লক্ষ টাকা। মাসুমের এই থানা সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ আইনের আশ্রয় নিতেও ভয় পায়।
আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মাসুম ও তার ভাই মাহফুজুর রহমান কালাম সবসময় দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে তারা প্রকাশ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর হয়ে কাজ করেন।
তাদের মূল লক্ষ্য থাকে দলের নিবেদিতপ্রাণ প্রার্থীদের পরাজিত করে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা। এমনকি বিগত নির্বাচনগুলোতে নৌকা বিরোধিতার অডিও ও ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হলেও রহস্যজনক কারণে তারা বারবার ছাড় পেয়ে গেছেন।
এই দুই ভাইয়ের অপকৌশলের কারণে সোনারগাঁয়ে আওয়ামী লীগ আজ কয়েক ভাগে বিভক্ত।
আওয়ামী লীগের এই দুর্দিনে যখন দলের সুশৃঙ্খল ও ত্যাগী নেতৃত্ব প্রয়োজন, তখন মোস্তাফিজুর রহমান মাসুমের মতো একজন চিহ্নিত দখলবাজ ও চাঁদাবাজকে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি করায় সাধারণ কর্মীরা হতাশ।
তারা মনে করছেন, মাসুমের মতো বিতর্কিত নেতাদের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে ব্যক্তিগত আখের গোছানোর যে পথ মাসুম বেছে নিয়েছেন, তাতে সাধারণ জনগণের সাথে আওয়ামী লীগের দূরত্ব বাড়ছে।
মোস্তাফিজুর রহমান মাসুমের এই বেপরোয়া আচরণের মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করেন তার বড় ভাই সদ্য নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান কালাম।
কালামের রাজনৈতিক প্রভাব ও মাসুমের সন্ত্রাসী বাহিনী মিলে সোনারগাঁয়ে এক অঘোষিত রাজত্ব কায়েম করেছে। এই দুই ভাইয়ের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মনে করেন, মাসুমের মতো ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া মানেই হচ্ছে অপরাধীদের উৎসাহিত করা।
তারা বলছেন, “আওয়ামী লীগ কোনো দখলবাজ বা চাঁদাবাজের দল নয়। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার আদর্শের কর্মীরা কখনো সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করতে পারে না।”
অবিলম্বে এই বিতর্কিত নেতার পদ বাতিল করে দলের আদর্শিক ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের হাতে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যথায় সোনারগাঁয়ে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মাসুমের এই বিপুল সম্পদের উৎস কী? কেন তিনি বারবার নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতা করেন? আর কোন অদৃশ্য শক্তিতে তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে মরিয়া সোনারগাঁয়ের সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগের কোটি কোটি কর্মী।
পড়ুন : বারদী-সোনারগাঁও সমাজ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে ৭০০ পরিবারে ঈদ উপহার, মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত!


