স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও মেহেরপুরের অধিকাংশ বধ্যভূমি এখনো সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। যেগুলো আংশিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। বিভিন্ন জাতীয় দিবস এলেই কিছু বধ্যভূমিতে সাময়িক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম দেখা গেলেও বছরের বাকি সময় এগুলো থাকে অবহেলায়। ফলে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গণহত্যা এবং হানাদার বাহিনীর নির্মমতার বাস্তব চিত্র সম্পর্কে জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও গণকবরে নিহতের থাকা নিহতর পরিবাররা পান নিয়ে এখনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।
ভাটপাড়া গ্রামের কৃষক সুজন মন্ডল বলেন, অনেক বধ্যভূমি এখন আর চেনার উপায় নেই। কোথাও গড়ে উঠেছে চাষাবাদ, কোথাও আবার মাদকসেবীদের আড্ডাখানা। বধ্যভূমির পবিত্রতা নষ্ট করে সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডও চলছে বলে জানান তারা। উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের অসামাজিক কার্যকলাপ এবং মাদকসেবীদের আনাগোনায় এসব স্থান তাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব হারাতে বসেছে।
সাহারবাটি গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি মোহন আলী ও মারাফত আলী জানান, ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর ভাটপাড়া কুঠিবাড়িতে ক্যাম্প বসিয়ে হানাদাররা মজিবর রহমান, আফসার মালিথা, জবতুল্লাহসহ ৮ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে ধরে এনে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। লাশগুলো কবর দিতে সাহস করেনি কেউ। হত্যার সাত দিন পর লাশের গন্ধে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলে হানাদারদের অনুমতিক্রমে সাহারবাটি গ্রামের মৃত. আবদুুর রসিদ, গোলাম হোসেন ও ইদ্রিস আলীর জমিতে পাশাপাশি দুটি কবর খুঁড়ে লাশ কবর দেওয়া হয়।
ভাটপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মহিবুল ইসলাম জানান, বধ্যভূমির বাঁধানো কবরগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মিত দেখভালের অভাবে এগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি উদ্যোগে এসব স্থান সংরক্ষণ, তালিকাভুক্তকরণ এবং যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন।
স্থানীয় যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হুদা বলেন, শুধু মেহেরপুর নয়, পাশের অনেক জেলার মানুষকে ধরে নিয়ে এখানে হত্যা করেছে পাক সেনারা। এখানে তারা গড়ে তুলেছিল টর্চার সেল। সেখানে বাঙালিদের ধরে এনে চালানো হতো নির্যাতন। এমনকি একটি গোল চিহ্নের মধ্যে সবাইকে প্রবেশ করানো হতো। শুরু করত লাঠিপেটা। দাগের বাইরে চলে আসলেও তাঁর চোখ-মুখ বেঁধে আবারও চালানো হতো নির্যাতন।’ তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরোলেও জায়গাটি সংরক্ষণ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
সাহারবাটি টেপুখালির মাঠে শহিদ হওয়া সাকের আলী ছেলে আব্দুস সাত্তার বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত আমরা সরকারিভাবে কোন সুযোগ সুবিধা বা সম্মানী পায়নি। শহীদ জবুতুল্লাহ্ এর ছেলে হাফিজুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ১৯৭১ সালে আমার বাবা ভারত থেকে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজিপুর হয়ে বাড়ি ফেরার পথে হিন্দা নামক স্থানে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আটক করে। বাবা সহ আরো আটজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভাটপাড়া টেপুখালির মাঠে নিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী। বাবার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী নামাজরত অবস্থায় তিনটি গুলি করে হত্যা করে বাবাকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। পরে হত্যার ৩-৪ দিন বাবা সহ আরো ৭জনের মরদের থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয়দের সহায়তাই আমার পরিবারের সদস্যরা বাবার মরাদেহ সনাক্ত করে। পাক হানাদার বাহিনী মরদেহ বাড়িতে না নেওয়ার অনুমতি দেওয়ায় ভাটপাড়ার টেপো খালির মাঠে চাপামাটি দেয়া হয়। তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছর গণহত্যা দিবস আসলে কেবল আমাদেরকে স্মরণ করে প্রশাসন থেকে। প্রতিবছর জেলা প্রশাসক এসে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এখন পর্যন্ত আমার বাবাকে বা আমার পরিবারকে সম্মান করা হয়নি। এক সময় আশায় আশায় বুক বেঁধেছিলাম এখন সে আশাও হারিয়ে ফেলেছি। ১৯৭১ সালের শহীদ হওয়ার পরেও রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানী পাবে কিনা এ নিয়ে রয়েছে সংশয়।
শহীদ পরিবারের সদস্য সাইদুর রহমান টেবু ও রানু বিশ্বাস বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা খুব ছোট। হঠাৎ একদিন রাতে আমাদের বাবাদের ধরে নিয়ে যায় মিলিটারি বাহিনী। এরপর থেকে আর সন্ধান মেলেনি তাঁদের। ধারণা করা হচ্ছে, ওই মাঠেই তাঁদের হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বদ্ধভূমিটি। অন্তত বছরে দুটি দিন হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ফুল দিয়ে যেন শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেন।
মুক্তিযেদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন, বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষন করা না হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম জানতে পারবে না মুক্তিযোদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী কিভাবে আমাদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতন করেছে। যুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং দেশপ্রম জাগ্রত করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মুনছুর আলম খাঁন বলেন, এরই মধ্যে কয়েকটি বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাকি যেগুলো এখনও সংস্কার করা সম্ভব হয়নি সেগুলো সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
তিনি আরো বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে গাংনী উপজেলার দু’টি গণকবরে দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। গাংনী উপজেলার সাহারবাটি ইউনিয়নের ভাটিপাড়া নীলকুঠির পাশে ৭১ লাখ ১৭ হাজার টাকা ও একই ইউনিয়নের সাহারবাটি টেবুখালির মাঠ গণকবরে ৭০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ে দুটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রকল্প দু’টি বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত বিভাগ মেহেরপুর।
মেহেরপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শামসুল আলম সোনা বলেন, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী নিরীহ মানুষ ও বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে এসব স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করে। জেলায় ৭ থেকে ৮টি গণকবর থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশই অরক্ষিত। তিনি দ্রুত সরকারি উদ্যোগে এসব গণকবর তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষণ করা হবে বলে জানান।
দেশ স্বাধীনের ৫৫ বছর পেরোলেও গণহত্যার স্থানগুলো সংরক্ষণ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আব্দুল্লাহ আল আমিন ধুমকেতু। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য বদ্ধভূমি। যা এখনো সংরক্ষণ করা হয়নি। অথচ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই এ স্থানগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে তরুণেরা জানতে পারে দেশ স্বাধীনের গৌরবগাথা ইতিহাস।
গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনোয়ার হোসেন জানান, বধ্যভূমি ও গণকবর সংরক্ষণে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুর জেলায় প্রায় ১৫টি বধ্যভূমি রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩ থেকে ৪টি আংশিকভাবে শনাক্ত হয়েছে। বাকিগুলো এখনো অবহেলা ও অযত্নে হারিয়ে যাওয়ার পথে।
পড়ুন:নেত্রকোনায় নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসকের সাথে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মতবিনিময়
দেখুন:ভেসে উঠেছে ইরানের মি/সা/ই/ল সিটি, আন্তর্জাতিক
ইমি/


