‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’- কালজয়ী এই গানের লাইনটিকে যেন নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন নেত্রকোনার দুর্গাপুরের তারা মিয়া। মানুষের উপকার করতে যে অঢেল সম্পদের প্রয়োজন নেই, বরং একটি সুন্দর আর বিশাল হৃদয়ই যথেষ্ট, তারই উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত তিনি। নিজের কষ্টার্জিত ক্ষুদ্র আয় থেকে একটু একটু করে টাকা জমিয়ে তিনি তা ব্যয় করেন অসহায় ও এতিম শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্গাপুরে দুটি এতিমখানার হতদরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছেন ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ খ্যাত তারা মিয়া।
বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুরে দুর্গাপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠানিকভাবে ও আনন্দঘন পরিবেশে এ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
জানা যায়, স্থানীয় চণ্ডিগড় অনাথ আশ্রম এবং কুল্লাগড়া স্বামী বিবেকানন্দ অনাথ আশ্রমের শিক্ষার্থীদের জন্য এই সহায়তার আয়োজন করা হয়। এদিন তারা মিয়া নিজ হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পুষ্টিকর ও দরকারি খাবারের প্যাকেট আশ্রমের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন।
তারা মিয়ার এমন মহতী উদ্যোগ নতুন কিছু নয়, বরং এটি তার দীর্ঘদিনের সাধনা। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি রিকশা চালিয়ে উপার্জিত অর্থ থেকে প্রতি মাসে কিছু কিছু টাকা জমিয়ে আসছিলেন। সেই জমানো টাকা দিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সাধারণ ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ, খেলাধুলার সামগ্রী এবং তীব্র শীতের সময় ছিন্নমূল মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করে আসছেন তিনি।
বর্তমানে তিনি আর রিকশা চালান না। জীবিকার তাগিদে এখন ঢাকায় একটি ফার্মে কাজ করছেন। তবে পেশা বা স্থান বদলালেও বদলায়নি তার মানবিকতা। ঢাকার সীমিত আয় থেকেও টাকা সঞ্চয় করে এলাকার অসহায়দের সহায়তা অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
নিজের এমন নিঃস্বার্থ উদ্যোগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তারা মিয়া বলেন, “আমি নিজে একজন গরীব মানুষ। তাই গরীব বা অসহায়দের বুকের চাপা কষ্ট আর মর্ম আমি খুব ভালো করেই বুঝি। ছোটবেলায় আমার খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে পারিনি। সেই আক্ষেপ আর কষ্ট থেকেই এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছি, যাতে তাদের জীবনে একটু হলেও স্বস্তি আসে।”
এ সময় তিনি সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তা করতে সকলের এগিয়ে আসা উচিত। সবাই যদি একটু একটু করে হাত বাড়ায়, তবে এদের জীবন বদলে যেতে পারে।”
খাদ্যসামগ্রী বিতরণকালে প্রেসক্লাব মিলনায়তনে উপস্থিত ছিলেন, দুর্গাপুর প্রেসক্লাব সভাপতি তোবারক হোসেন খোকন, সাবেক সভাপতি এস এম রফিকুল ইসলাম রফিক, নির্মলেন্দু সরকার বাবুল, সাংবাদিক এইচ এম সাইদুল ইসলাম, আল নোমান শান্ত, রাজেশ গৌড় প্রমুখ।
উপস্থিত সাংবাদিক ও সুধীজন তারা মিয়ার এমন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে তারা মিয়ার নিরলস এই কাজ স্থানীয়দের কাছে তাকে প্রকৃত অর্থেই ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পড়ুন : নেত্রকোনার মদনে হেলিপ্যাডের পাশে মাদক সেবন: ২ যুবকের কারাদণ্ড


