বিজ্ঞাপন

পর্তুগাল এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার কেন্দ্র  

একসময়ের অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পর্তুগাল আজ ইউরোপের বুকে এক উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্থিতিশীল রাজনীতি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং ব্যবসা-বান্ধব সরকারি নীতির সমন্বয়ে দেশটি এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আবাসন খাতে পর্তুগালের অভূতপূর্ব সাফল্য ইউরোপের অন্য বড় দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৫ এবং ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোজোনের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় পর্তুগালের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা দেশটিকে আন্তর্জাতিক পুঁজি বিনিয়োগের জন্য অন্যতম প্রধান গন্তব্যে রূপান্তরিত করেছে। আধুনিক অবকাঠামো এবং দক্ষ জনশক্তির এই দেশ এখন কেবল পর্যটনের জন্যই নয়, বরং টেকসই ও নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য বিশ্বমঞ্চে এক আদর্শ উদাহরণ।

পর্তুগালের অর্থনীতি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর দেশটি যেভাবে পুনরুদ্ধার করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ দেশটির অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পর্তুগাল সরকার বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো “গোল্ডেন ভিসা” কর্মসূচি, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগের বিপরীতে বিদেশি নাগরিকদের আবাসনের সুযোগ প্রদান করা হয়। এছাড়া নন-হ্যাবিচুয়াল রেসিডেন্ট (NHR) ট্যাক্স স্কিম বিনিয়োগকারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য কর সুবিধা নিশ্চিত করছে, যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক।

প্রযুক্তি খাতে পর্তুগাল দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী লিসবন ইতোমধ্যে ইউরোপের অন্যতম প্রধান স্টার্টআপ হাব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি সম্মেলন Web Summit নিয়মিতভাবে এখানে অনুষ্ঠিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আগমন বাড়ছে। পাশাপাশি পোর্তো শহরও প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।

পর্যটন খাত পর্তুগালের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি। মনোরম সমুদ্রসৈকত, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটককে আকৃষ্ট করছে। এর ফলে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও পর্তুগাল উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটি ইতোমধ্যে বায়ু, সৌর এবং জলবিদ্যুৎ থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। সরকারের লক্ষ্য ভবিষ্যতে আরও বেশি পরিমাণে পরিষ্কার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়া, যা পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে।

রিয়েল এস্টেট খাত পর্তুগালে বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিশেষ করে লিসবন, পোর্তো এবং আলগারভ অঞ্চলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই খাতে উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পর্তুগালকে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ প্রদান করছে। এছাড়া দেশটির কৌশলগত অবস্থান ইউরোপ, আফ্রিকা এবং আমেরিকার বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আবাসন খাতে মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তবুও সরকার এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

বিনিয়োগকারীরা এই দেশকে বেছে নিচ্ছেন:

১. স্থিতিশীল অর্থনীতি ও নিরাপদ পরিবেশ

পর্তুগালের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় এখানে বিনিয়োগ করা অনেকটাই নিরাপদ মনে করেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

২. বিনিয়োগবান্ধব সরকারি নীতি

সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা সুবিধা দিচ্ছে, যেমন:

•   গোল্ডেন ভিসা প্রোগ্রাম

•   ট্যাক্সে বিশেষ ছাড় (NHR স্কিম)

•   ব্যবসা শুরু করার সহজ প্রক্রিয়া

এসব কারণে নতুন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

৩. ইউরোপের গেটওয়ে হিসেবে অবস্থান

পর্তুগালের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে সহজেই ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করা যায়। আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য এটি বড় সুবিধা।

৪. প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ হাব

লিসবন ও পোর্তো শহর এখন ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ স্টার্টআপ কেন্দ্র। Web Summit-এর মতো বড় প্রযুক্তি ইভেন্ট এখানে অনুষ্ঠিত হয়, যা নতুন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে।

৫. রিয়েল এস্টেট ও পর্যটনে লাভজনক সুযোগ

•   পর্যটনের জন্য বিখ্যাত হওয়ায় হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায় ভালো লাভের সুযোগ

•   লিসবন, পোর্তো ও আলগারভ অঞ্চলে সম্পত্তির মূল্য ক্রমশ বাড়ছে

এ কারণে অনেকেই রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করছেন।

৬. উচ্চ জীবনমান ও কম খরচ

ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় পর্তুগালে জীবনযাত্রার খরচ তুলনামূলক কম, কিন্তু জীবনমান অনেক উন্নত। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় আকর্ষণ।

৭. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতি

পর্তুগাল পরিষ্কার জ্বালানি ব্যবহারে ইউরোপের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। যারা পরিবেশবান্ধব (green investment) করতে চান, তাদের জন্য এটি আদর্শ জায়গা।

পর্তুগাল এমন একটি দেশ যেখানে নিরাপত্তা, লাভের সম্ভাবনা, ব্যবসার সুযোগ এবং উন্নত জীবনযাত্রা—সবকিছু একসাথে পাওয়া যায়। তাই বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা দিন দিন এই দেশটির দিকে আরও বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

পড়ুন: বংশালে ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন