তামাক করনীতি হতে হবে সহজ, স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও টেকসই। এ খাতে এমন একটি বাস্তবসম্মত কর কাঠামো জরুরি যেটি রাজস্ব আদায় ঠিক রাখা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহায়তা করবে।
বুধবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘তামাক কর: স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব বনাম দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের একজন প্রতিনিধি। যেখানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন পিআরআইর গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিআরআইর মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।
আলোচনায় অংশ নেন ইনস্টিটিউট অব ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. এম কে মুজেরী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস, দি ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, দৈনিক সমকালের সহযোগী সম্পাদক জাকির হোসেন, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো খন্দকার সাখাওয়াত আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ওয়াসিক সাজিদ খান এবং বিএটির গ্রুপ হেড অব ফিসকাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সাইমন ট্রাসলার।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের সিগারেটের বাজার নিয়ে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে তামাক খাতে করের হার এবং দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রকৃত অর্থে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৪ সালের জুন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দাম ও শুল্ক অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সিগারেটের বিক্রি কমে গেছে। যার ফলে রাজস্ব আয়ে খুবই সামান্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে তামাকের ওপর করের হার প্রায় ৮৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। করের বোঝা এই পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় এখন শুধুমাত্র কর বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ কমে এসেছে। ২০২৪ সালের জুন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পর্যায়ক্রমে দাম ও শুল্ক বাড়ানোর ফলে সিগারেটের গড় দাম অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে তামাক কর থেকে অর্জিত রাজস্বের প্রবৃদ্ধি নামমাত্র বাড়লেও প্রকৃত অর্থে তা ছিল স্থবির। করের এই আকস্মিক সমন্বয় অবৈধ বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি উচ্চস্তর ও নিম্নস্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবধান তামাক শিল্পের বাজারমূল্য কমিয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক এই প্রবণতাগুলো নিয়ে আলোচনায় বক্তারা বলেন, রাজস্ব আহরণ ও বাজার স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও কাঠামোগত করনীতির প্রয়োজন। ঘন ঘন মূল্য ও কর সমন্বয় বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, নিম্নমূল্যের পণ্যে মানুষের ঝোঁক বাড়ায় এবং অবৈধ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে।
তারা আরও বলেন, বর্তমান বহুস্তরবিশিষ্ট কর কাঠামো জটিল এবং এটি রাজস্বের পূর্বানুমানকে দুর্বল করে। তাই ধীরে ধীরে মূল্যভিত্তিক কর পদ্ধতি থেকে সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতিতে রূপান্তরের সুপারিশ করেন তারা। তাঁদের মতে, সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতির বাস্তবায়ন সহজ। এটি রাজস্ব আদায়েও সহায়ক।
বক্তারা বলেন, অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা জোরদার, বাজার পর্যবেক্ষণ আরও কার্যকর করা এবং কারখানা পর্যায়ে সিগারেট উৎপাদনের বিষয়টি লক্ষ্য রাখার জন্য আধুনিক ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। তারা সতর্ক করে বলেন, বর্তমান কর কাঠামোর ফলে বৈধ উৎপাদকদের নিট মুনাফা এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে যেখানে অবৈধ বাণিজ্য ক্রমেই বেশি লাভজনক হয়ে উঠছে। এ প্রেক্ষাপটে, টেকসই নীতি ও আইন-শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর তদারকির সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, রাজস্ব আদায়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, বিনিয়োগে সহায়তা এবং তামাক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, স্বচ্ছ ও দূরদর্শী তামাক কর কাঠামো অপরিহার্য।
পড়ুন: রাজধানীতে বিক্ষোভের ডাক দিলো জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট
আর/


