বিজ্ঞাপন

ছাত্রীদের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, আর অধ্যক্ষের রাজকীয় রুম: ক্ষোভ ডেপুটি স্পিকারের

নেত্রকোনার দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের সার্বিক অব্যবস্থাপনা, শিক্ষকদের ক্লাসে অনুপস্থিতি এবং ছাত্রীনিবাসে নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি শিক্ষকদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যারা নিয়মিত ক্লাস নেবেন না, তারা যেন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পরিস্থিতি উন্নতির জন্য তিনি ছয় মাসের আল্টিমেটাম দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুর সোয়া ২টার দিকে দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীদের সাথে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে, শনিবার দুপুরে ডেপুটি স্পিকার কলেজ প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। এ সময় স্থানীয় আদিবাসী ছাত্রীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির আদলে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে প্রধান অতিথিকে স্বাগত জানায়। পরে তিনি কলেজ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন।

কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি এম এ জিন্নাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় এ সভায় ব্যারিস্টার কায়সার কামাল কলেজের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে কড়া সমালোচনা করেন।

বক্তব্যের শুরুতেই ডেপুটি স্পিকার কলেজের শিক্ষক ও স্টাফদের পরিসংখ্যান জানতে চান। তিনি উল্লেখ করেন, কলেজের ৫১ জন স্টাফের মধ্যে ৩৪ জন একাডেমিক শিক্ষক। এর মধ্যে ২১ জন এমপিওভুক্ত। কিন্তু এমপিওভুক্ত অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে আসেন না বলে তিনি অভিযোগ পেয়েছেন ।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অনেকেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক হয়েও ওকালতি করেন বা অন্য পেশায় যুক্ত আছেন। আগের রাতে মামলার প্রস্তুতি নিয়ে উকালতি করতে হয়। তেমনি প্রস্তুতি ছাড়া পরের দিন ক্লাসে আসা সম্ভব নয়। আমি নিজে আইন পেশায় জড়িত, বিষয়টা আমি জানি। আমি স্পষ্ট বলতে চাই, যারা এমপিওভুক্ত আছেন এবং যারা নিয়মিত ক্লাস করাতে পারবেন না, তারা আল্লাহর ওয়াস্তে কলেজটা ছেড়ে দিন। অন্যথায় আইন সবার জন্য সমান, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কলেজের ছাত্রীনিবাসের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য। ছাত্রীনিবাসে পুরুষ শিক্ষকদের প্রবেশ এবং সেখান থেকে গাছ কেটে চুরির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “মহিলা হোস্টেলে পুরুষ টিচার যাবে কেন? এটা কিভাবে সম্ভব? আজকে এই মুহূর্ত থেকে কোনো পুরুষ মানুষ মেয়ে হোস্টেলে প্রবেশ করতে পারবে না।”

এ সময় তিনি উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পৌর প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে হোস্টেলের পেছনে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “যারা হোস্টেলে থাকে তারা আমাদেরই সন্তান। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”

কলেজের ছাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া ফির বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি অধ্যক্ষের উদ্দেশে বলেন, “ছাত্রীদের কাছ থেকে ৪০০ টাকা করে নিচ্ছেন, বিনিময়ে কী দিচ্ছেন? ছাত্রীদের হলে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, তারা রান্না করে খেতে পারে না। অথচ আপনার রুমে গিয়ে দেখলাম রাজকীয় অবস্থা! ড্রয়িং রুমের চেয়েও সুন্দর কার্পেট মোড়ানো আপনার রুম। এটা আমার জন্য লজ্জাকর।” আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তিনি একজন স্বাধীন অডিটর নিয়োগের কথাও জানান।

ডেপুটি স্পিকার শিক্ষকদের নিজেদের শোধরানোর জন্য আগামী ছয় মাসের সময় বেঁধে দেন। তিনি বলেন, “অতীত অতীতই। আজ থেকে আমরা নতুন টার্গেট নিয়ে কাজ করব। ছাত্রীর সংখ্যা বাড়াতে হবে, শিক্ষার মান বাড়াতে হবে এবং প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হবে। যারা প্রক্সি দেওয়ার দুঃসাহস দেখাবেন, তারা দয়া করে পদত্যাগ করুন।”

তিনি আরও বলেন, “আমার স্বপ্ন, এই কলেজটিকে এমন একটি মানে নিয়ে যাওয়া যাতে নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ থেকে মেয়েরা এসে এখানে পড়াশোনা করে। দুর্গাপুরে অবস্থিত ১৬০ বছরের পুরোনো একটি লাইব্রেরি বেদখল হয়ে আছে, মহারাজার আমলের ঘরগুলো ভেঙে পড়ছে, এগুলোর উন্নয়ন করতে হবে। আমরা সবাই মিলে নতুন দুর্গাপুর গড়তে চাই, যেখানে আমাদের সন্তানেরা মানবিকতার সাথে বেড়ে উঠবে।”

মতবিনিময় এ সভায় নেত্রকোনা জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. নুরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রাফিকুজ্জামানসহ কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকারের কড়া ও স্পষ্ট বক্তব্য উপস্থিত সবার মাঝেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পড়ুন:

দেখুন:

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন