আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ২৫ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শাটডাউনে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন স্বাস্থ্য সহকারীরা। দেশের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রে ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করা স্বাস্থ্য বিভাগের ‘পোর্টার’দের ৯ মাস ধরে বেতন বন্ধ। ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে, পদোন্নতি না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্য সহকারী, পরিদর্শক ও সহকারী পরিদর্শকরা। তারা অনেক দিন ধরে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে আসছেন। বারবার আশ্বাস পেলেও এখন পর্যন্ত সমাধান না আসায় সবার মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় তারা সবাই মিলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না তারা। এতে চলমান হামের বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে টিকাকেন্দ্রে টিকা সরবারাহের কাজ করেন পোর্টাররা। প্রতি তিন ইউনিয়ন মিলে একজন পোর্টার দায়িত্ব পালন করেন। তারা পুরো মাস কাজ করলেও বেতন পান ২৪ দিনের, দৈনিক হাজিরা ৭০০ টাকা। কোনোদিন অনুপস্থিত থাকলে ওইদিনের বেতন পান না। ২০২৪ সালের অক্টোবর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত বেতন পাননি পোর্টাররা। বকেয়া বেতনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে তারা দাবি জানিয়ে আসলেও কারো কাছ থেকে কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়লে পোর্টারদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক বরাবর পোর্টারদের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য একটি বাজেট বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। সেই চিঠিতে পোর্টারদের বকেয়া বেতন পরিশোধ বাবদ ১৯ কোটি ২৫ লক্ষ্য ৭৩ হাজার টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
দেশের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রে কর্মরত ১৫ হাজার স্বাস্থ্য সহকারী পরিদর্শক ও সহপরিদর্শক দীর্ঘদিন ধরে ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। পদোন্নতি, নিয়োগবিধি সংশোধন এবং টেকনিক্যাল পদমর্যাদা প্রদানসহ বিভিন্ন দাবিতে গত বছরের ২৫ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে একই বছরের ৯ জুলাই দেশব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৯ নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসজুড়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে বৃহৎ কর্মসূচি পালন করেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বর্তমানে ছয় দফা দাবির মধ্যে তিনটি দাবিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। দাবিগুলো হলো চাকরির গ্রেড ১৬ থেকে ১৪-তে উন্নীতকরণ, নিয়োগবিধি সংশোধন এবং স্বাস্থ্য সহকারীদের টেকনিক্যাল পদমর্যাদা প্রদান।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, যৌক্তিক দাবি আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে আন্দোলন করলেও সরকার এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তাদের অভিযোগ, দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকার সাময়িকভাবে উদ্যোগ নিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবির বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি থাকে না।
দেশের সাড়ে তিন হাজার সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও ১২শ পরিদর্শক দীর্ঘদিন ধরে তাদের পদোন্নতির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য পরিদর্শকেরা ১৪তম গ্রেডে বেতন পান। তারা তা ১২তম গ্রেডে উন্নীত করতে দাবি জানিয়ে আসছেন। আর সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকেরা ১৫তম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেডে পদোন্নতি চাচ্ছেন। একই সাথে পরিদর্শকদের উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা রাখা এবং সরকার থেকে প্রত্যেক স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের জন্য মোটরসাইকেল বরাদ্দের দাবি জানানো হয়েছে।
বর্তমানে চলমান হাম সংকট মোকাবিলায় দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সরকার। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা অসহযোগিতার পরিকল্পনা করেছিলেন, যা গত ৪ এপ্রিল কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। এরই মধ্যে, তাদের ঘোষণার আগেই গত ২ এপ্রিল স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া ও বঞ্চনার বিষয়গুলো সমাধানে ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ দিতে একটি কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হানকে সভাপতি করে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি, উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী এবং সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সংগঠনের প্রতিনিধি। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে কমিটির সদস্যদের নিয়ে গতকাল (৬ এপ্রিল) একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বৈঠকে অংশ নিতে আসা পোর্টার ও স্বাস্থ্য সহকারী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

