বিজ্ঞাপন

জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ‘পুনর্মিলনের’ ডাক তাইওয়ানের বিরোধীদলীয় নেতার

তাইওয়ানের বিরোধীদলীয় নেতা চেং লি-উন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিংয়ে সাক্ষাৎ করেছেন। দুজনই তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন এবং দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের ‘শান্তিপূর্ণ’ সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) চেং লি-উনকে বেইজিংয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান জিনপিং। তারা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ছবি তোলেন এবং প্রকাশ্যে বক্তব্য বিনিময় করেন। এরপর পাশাপাশি রুদ্ধদ্বার বৈঠকের অংশ নেন।

চেং ২০১৫ সালে সিঙ্গাপুরে প্রেসিডেন্ট মা ইং-জিউর শি জিনপিংয়ের সাথে সাক্ষাতের পর চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করা সর্বোচ্চ পর্যায়ের তাইওয়ানি নেতা। প্রায় ৮ বছর পর ২০২৩ সালে মা ইং-জিউর চীন সফরে যান এবং জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

চেং এবং মা ইং-জিউর দুজনই তাইওয়ানের কুয়োমিনতাং (কেএমটি) দলের সদস্য। এটি একটি রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল এবং তাইওয়ানের স্বশাসিত গণতান্ত্রিক সরকারের সাথে চীনের আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে।

বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে চেং বলেন, চীন ও তাইওয়ানের নেতাদের উচিত ‘রাজনৈতিক সংঘাত ও পারস্পরিক শত্রুতা অতিক্রম করা। আমাদের দুই দলের অবিরাম প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা আশা করি তাইওয়ান প্রণালী আর কখনও সংঘাতের সম্ভাব্য কেন্দ্র বা বাইরের শক্তির দাবার বোর্ড হবে না।’

‘বরং এটি এমন একটি প্রণালী হবে যা পারিবারিক সম্পর্ক, সভ্যতা এবং আশার সাথে যুক্ত করে – যা শান্তির প্রতীক হিসেবে দুই পাশের চীনা জনগণ একসাথে রক্ষা করবে,’ যোগ করেন তিনি।

অন্যদিকে তাইওয়ান ও চীনের অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতি আছে উল্লেখ করে জিনপিং বলেন, ‘তাইওয়ানসহ সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষ’ একসাথে চীনের গৌরবময় ইতিহাস লিখেছে। চীনের সব সন্তান একই চীনা শিকড় ও চেতনা ভাগ করে। এটি রক্তসম্পর্ক থেকে এসেছে এবং ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত – এটি ভুলে যাওয়া বা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, কুয়োমিনতাং এবং তাইওয়ানের অন্যান্য অংশের সাথে মিলিতভাবে বেইজিং তাইওয়ান প্রণালীজুড়ে ‘শান্তির জন্য কাজ করতে’ প্রস্তুত।

দুজনই ‘বিদেশি হস্তক্ষেপের’ বিরোধিতা করেন। এর মাধ্যমে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। চেং বলেন, তিনি তাইওয়ানের সামরিক প্রস্তুতি ধীর করতে চান, অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের একজন বিশেষজ্ঞ ওয়েন-টি স্যুং আল জাজিরাকে জানান।

তাইওয়ানের সামরিক সম্প্রসারণ এখন সংসদে একটি বড় বিতর্কের বিষয়। কুয়োমিনতাং কয়েক মাস ধরে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট আটকে রেখেছে। দলটি বলছে বাজেটটি অনেক বড় এবং অস্পষ্ট। তারা এর বদলে ১২ বিলিয়ন ডলারের একটি ছোট বাজেট প্রস্তাব করেছে।

বৈঠকের আগে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে (ডিপিপি) ফেসবুকে লেখেন, কুয়োমিনতাং ইচ্ছাকৃতভাবে আন্তঃদলীয় আলোচনাকে এড়িয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনে দেরি করছে।

লাই বলেন, তার সরকারও শান্তি চায়, তবে ‘অবাস্তব কল্পনা’ নয়। শি শান্তির কথা বললেও চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ২০২২ সাল থেকে চীন ছয় দফা বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে তাইওয়ান প্রণালীতে।

‘ইতিহাস দেখায়, স্বৈরাচারী শাসনের সাথে আপস করলে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র হারায়; এতে স্বাধীনতা বা শান্তি আসে না,’ লাই ফেসবুকে লেখেন।

চীন ডিপিপিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে অভিযুক্ত করে। ডিপিপি আলাদা তাইওয়ানি পরিচয়কে সমর্থন করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তাইওয়ানের অবস্থান শক্ত করতে চায়, যা বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করে।

২০১৬ সালে ডিপিপি ক্ষমতায় আসার পর চীন তাইওয়ানের সাথে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, তবে কুয়োমিনতাংসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখে। এই কারণেই চেং-এর চীন সফর তাইওয়ানের কিছু অংশে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ডিপিপির মধ্যে।

বৈঠকের পর চেং সাংবাদিকদের বলেন, তিনি চূড়ান্ত একীকরণের বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেননি, তবে তার লক্ষ্য হলো ইতিহাস ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে ‘পুনর্মিলন’। তবে কুয়োমিনতাং ও সিসিপি সবসময় একমত ছিল না।

১৯২০ থেকে ১৯৪০ দশক পর্যন্ত তারা একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে লড়াই করেছে, কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় সাময়িকভাবে বিরতি ছিল।

পরবর্তীতে কুয়োমিনতাং নেতৃত্বাধীন সরকার তাইওয়ানে পিছু হটে এবং ভবিষ্যতে চীনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই সংঘাত পুরোপুরি সমাধান হয়নি। সিসিপি এখনও তাইওয়ানকে একটি প্রদেশ হিসেবে দাবি করে এবং ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ বা সামরিকভাবে একীভূত করার লক্ষ্য রাখে।

তাইওয়ানের মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল জানায়, চেং-এর ‘এক পরিবার’ বক্তব্য তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে, কারণ এটি দুই সরকারের মধ্যে বিরোধকে একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখায়। ১৯৯০-এর দশকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পর তাইওয়ানে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং জাতীয়তাবাদ বেড়ে যায়।

২০২৫ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ মানুষ নিজেদের “তাইওয়ানি” হিসেবে চিহ্নিত করে, যা ১৯৯২ সালে ছিল ১৭.৬ শতাংশ। ‘তাইওয়ানি ও চীনা’ পরিচয় দেয়া মানুষের সংখ্যা কমে এসেছে, এবং শুধুমাত্র ‘চীনা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের সংখ্যা ২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : জামিনে মুক্তি পেলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলি

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন