বিজ্ঞাপন

কাগজে পোস্টিং, বাস্তবে ডেপুটেশন: চিকিৎসক সংকটে কলমাকান্দায় চরম ভোগান্তি

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। একদিকে চিকিৎসক ও জনবলের তীব্র সংকট, অন্যদিকে মূল্যবান যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে থাকা- সব মিলিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং চিকিৎসকদের দীর্ঘদিন ধরে ডেপুটেশনে (প্রেষণ) অন্য হাসপাতালে থাকার প্রবণতা। বাধ্য হয়ে রোগীরা ঝুঁকছেন ব্যয়বহুল বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের দিকে।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪১টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। এই ২০ জনের মধ্যেও চারজন চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেপুটেশনে রয়েছেন এবং একজন বছরের পর বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত।

শুধু চিকিৎসকই নন, অন্যান্য পদেও জনবল ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আটটি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র চার জন। নার্স ৩৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৪ জন। স্বাস্থ্য সহকারী ৫০টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ২৭ জন।

সীমিত সংখ্যক চিকিৎসকের মধ্যে ডেপুটেশনে অন্যত্র সেবা দেওয়ায় কলমাকান্দায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ডেপুটেশন ও অনুপস্থিত থাকা চিকিৎসকরা হলেন- ডা. এ. কে. এম আব্দুল্লাহ আল মামুন (কার্ডিওলজি): ২০২৩ সাল থেকে নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে কর্মরত।

ডা. মো. আব্দুল হান্নান (চক্ষু) তিনি ২০১৭ সাল থেকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত। ডা. মোহাম্মদ নঈম ইকবাল মোল্লা (শিশু) তিনি ২০২৪ সাল থেকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত। ডা. জেন্টি মজুমদার (সহকারী সার্জন) তিনি ২০২৪ সাল থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেপুটেশনে রয়েছেন। আর ডা. সজীব পাল চৌধুরী (আরএমও) তিনিও ২০১৯ সাল থেকে কর্মস্থলে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যারা এখানে থাকতে চান না, তাদের অন্যত্র বদলি করা হোক। এতে নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এখানে চাকরি করে অন্য জায়গায় সেবা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও জনবল সংকটের কারণে সেগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে। রেডিওগ্রাফার না থাকায় ৫০০ আরএমও ক্ষমতাসম্পন্ন এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জাম থাকলেও, অ্যানেসথেটিস্ট ও গাইনি বিশেষজ্ঞ একসঙ্গে না থাকায় অপারেশন সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে জরুরি মুহূর্তে গর্ভবতী নারীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।

এছাড়া, সরকারি একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক না থাকায় সেটিও কার্যত অচল। উল্টো অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল প্রাঙ্গণের ভেতরেই নিয়মিত ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্স পার্ক করে রাখা হয়, যা সেবার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি হাসপাতালটি পরিদর্শনে আসেন। সেবার মান দেখে তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পাশের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের উপচেপড়া ভিড় দেখে তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, “হাসপাতালের চেয়ে রোগী বেশি আপনাদের চেম্বারে- কী যে জাদু করেছেন আপনারা!” পরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, পর্যাপ্ত সরকারি সেবা না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি দ্রুত সেবার মান উন্নয়নের নির্দেশ দেন এবং রোগীদের যেকোনো অভিযোগ সরাসরি তাকে জানানোর আহ্বান জানান।

হাসপাতালের বেহাল দশার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ আল মামুনের প্রশাসনিক দুর্বলতাকেও দুষছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দায়িত্বে থাকলেও সেবার মানের কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেননি।

কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম এ প্রসঙ্গে বলেন, “ডা. আল মামুন ব্যক্তি হিসেবে ভালো হলেও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অনভিজ্ঞতার পরিচয় দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করায় এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে তার চলাফেরা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।” দ্রুত তাকে বদলি করা হলে হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ উন্নত হতে পারে বলে সচেতন নাগরিকরা মনে করেন।

সার্বিক বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ আল মামুন জানান, চিকিৎসক সংকট ও ডেপুটেশনের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে এবং ডেপুটেশনে থাকা চিকিৎসকদের ফিরিয়ে আনা গেলে সেবার মান অনেকটাই উন্নত হবে।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুল খালেকের মতে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল লক্ষ্যই হলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া। কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান চিত্র সেই লক্ষ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এখানকার স্বাস্থ্যখাতের সংকট অচিরেই আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

পড়ুন- ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে জনগণের কথা ভুলে গেছে বিএনপি: নাহিদ ইসলাম

দেখুন- দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হলেই আবারও ইরানে হা/ম/লা?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন