বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক : আলোচনায় থাকছে যেসব বিষয়

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরু হচ্ছে। আজ শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই আলোচনাকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন।

কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে

উভয় পক্ষই বড় ধরনের মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনায় বসছে। ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব শর্ত মেনে নেয়নি। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১০ দফা পরিকল্পনাটিকে ‘কার্যকরযোগ্য’ বলেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব বা শর্ত পেশ করেছে। তার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমানোর দাবি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিতে রাজি আছে। মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, এ বিষয়ে আপসের কোনো সুযোগ নেই।

অবশ্য ইরান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়নি।

আরেকটি বড় বিরোধের বিষয় লেবানন। বুধবার উত্তর লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যা বর্তমান যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসতে পারে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে হয় যুদ্ধবিরতি; নয়তো ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ—এই দুটোর একটি বেছে নিতে হবে।
আরাঘচি পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সেই বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননসহ পুরো অঞ্চলেই হামলা বন্ধ থাকবে।

তবে বুদাপেস্টে দেওয়া বক্তব্যে জে ডি ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের অবস্থানও এক্ষেত্রে একই।

চীনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ আল জাজিরাকে বলেন, আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই পরিবেশ ‘বিষিয়ে’ উঠেছে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল এই প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করতে বাধা সৃষ্টি করছে। লেবাননে অবিরাম হামলা চালিয়ে তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যাতে পক্ষগুলো আরও কঠোর অবস্থান নেয় এবং আলোচনা ভেঙে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই পর্যায়ে আমরা কেবল সতর্কভাবে আশাবাদী হতে পারি। কারণ, আলোচনা নিশ্চিতভাবেই জটিল ও দীর্ঘ হবে এবং তা ১৫ দিনের সময়সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক স্বাধীন বিশ্লেষক সাহার খানও একই মত পোষণ করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘আস্থার সংকটই’ সবচেয়ে বড় বাধা।

তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই এখন সর্বোচ্চ দাবি তুলে ধরে নিজেদের ‘বিজয়ী’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি যদি টিকে থাকে এবং তারা শেষ পর্যন্ত বৈঠকে বসে, সেটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বৈঠকের ফলাফল কী হতে পারে, বিপত্তি কোথায়

বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের গভীর অবিশ্বাসের কারণে স্বল্পমেয়াদে চূড়ান্ত সমাধান আসার সম্ভাবনা কম। ইসলামাবাদে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমরি মোগাদ্দাম তার মুছে দেওয়া পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলাকে তেহরান আলোচনা নস্যাৎ করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। লেবানন এখন দুই পক্ষের মধ্যে মূল বিভাজন রেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাসুদ খালিদ বলেন, শাহবাজ শরিফের বক্তব্যে লেবাননের স্পষ্ট উল্লেখ ইঙ্গিত দেয় যে- এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আগে আলোচনা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহু তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তানের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পরে যুদ্ধবিরতির আওতা থেকে লেবাননকে বাদ দেন। অন্যদিকে, ইরান লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে অনড়। তারা ফ্রান্সের মত কিছু দেশের সমর্থনও পাচ্ছে। চাবিকাঠি এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে।’

সাহার খানের মতে, লেবানন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ‘ব্রেকিং পয়েন্ট’ বা চরম সংকটের জায়গা। তিনি বলেন, ‘টেকসই সমাধান কেবল তখনই সম্ভব; যদি ইসরায়েল হামলা বন্ধ করে। আগের সব দফার বৈঠকে ইসরায়েলই ইরানে হামলা চালিয়ে আলোচনা ভেঙেছে। শেষ পর্যন্ত এটা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে—তারা কি যুদ্ধবিরতি বাতিল করে ইরানে হামলা করবে, নাকি ইসরায়েলকে থামতে বলবে।’

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফের মনে করেন, আলোচনায় ইসরায়েলের অনুপস্থিতি একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল এই যুদ্ধের একটি পক্ষ। এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে তাদের স্বার্থই সবচেয়ে বেশি। তাই, আলোচনা ও চূড়ান্ত সমাধানে তাদের অংশ হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে তারা সবসময়ই যুক্তি দিতে পারবে যে, তারা কোনো চুক্তির শর্তে একমত ছিল না।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ অবশ্য মনে করেন, শেষ পর্যন্ত চরম অবস্থানগুলো কিছুটা নরম হতে পারে। তার মতে, পারমাণবিক শক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কিছুটা সমঝোতা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বহুপক্ষীয় বোঝাপড়া সম্ভব হতে পারে। কারণ, দুই পক্ষই এখন ক্লান্ত এবং সংঘাত থেকে বিরতি চায়।

তবে এই শান্তি চুক্তির গ্যারান্টার বা জামিনদার কেউ হাতে চাইবে কি না, সে বিষয়ে মাসুদ খালিদ নিশ্চিত নন।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষে গ্যারান্টার হওয়ার ঝুঁকি কোনো একক দেশ নিতে চাইবে না। চীন অন্তত এই ঝুঁকি নেবে না।

তার মতে, যে কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সমর্থন প্রয়োজন হবে এবং সব পক্ষের জন্য সেই চুক্তি মানার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।

সাহার খান মনে করেন, গ্যারান্টার কে হবে, সেই প্রশ্ন তোলার সময় এখনো আসেনি। তিনি বলেন, ‘এই দফার আলোচনায় চীনের থাকার প্রয়োজন নেই। যুদ্ধবিরতি হলো একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং এর প্রথম লক্ষ্য আস্থা তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই আলোচনার সময় ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রেখে লেবাননে হামলা থামাতে পারে, সেটাই হবে বড় সাফল্য এবং ট্রাম্প তখন একে বিজয় হিসেবে দাবি করতে পারবেন।’

তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, রয়টার্স ও সিএনএন

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : পাকিস্তানের পথে জে ডি ভ্যান্স, ইরানি প্রতিনিধি দল পৌঁছেছে আগেই

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন