বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে দেশের অন্যতম সফল নারী ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত-এর ওপর আরোপিত দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের হয়ে একাধিক সাফল্য বয়ে আনা এই অ্যাথলেট ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ায় আন্তর্জাতিক অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি (ওয়াডা) তাকে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া সব ধরনের প্রতিযোগিতা থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত মাবিয়াকে জানিয়ে দিয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের শেষ দিকে। ইসলামিক সলিডারিটি গেমসকে সামনে রেখে নিয়মিত ডোপিং পরীক্ষার অংশ হিসেবে ২৯ অক্টোবর মাবিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণে তার শরীরে নিষিদ্ধ উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ে। জানা গেছে, তার নমুনায় ‘ডারউইক্স’ জাতীয় একটি ওষুধের উপাদান পাওয়া গেছে, যা সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর ডোপিং তালিকায় এটি নিষিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত।
এই পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন মাবিয়া আক্তার। তিনি জানিয়েছেন, পায়ের ব্যথা ও ফোলার সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ওই ওষুধ সেবন করেছিলেন এবং তার কাছে প্রেসক্রিপশনও রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ডোপিং বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো অ্যাথলেট যদি বিশেষ প্রয়োজনে নিষিদ্ধ তালিকার ওষুধ গ্রহণ করতে চান, তাহলে আগে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশন বা অলিম্পিক কমিটির মেডিকেল টিমের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক। এই প্রক্রিয়াটি অনুসরণ না করায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকছে মাবিয়ার সামনে। বিওএ থেকে পাওয়া চিঠি অনুযায়ী, তিনি ১৪ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। এ বিষয়ে তিনি জানান, নিয়ম মেনে ওষুধ গ্রহণের বিষয়ে তাদের সবসময় সতর্ক করা হতো, এমনকি সাধারণ ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রেসক্রিপশন রাখার নির্দেশনা ছিল। সেই নিয়ম অনুসরণ করেই তিনি চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ করেছিলেন বলে দাবি করেন এবং শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে এই ঘটনাকে দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করে বিওএর মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা বলেন, সামনে এশিয়ান বিচ গেমস, এশিয়ান গেমস ও কমনওয়েলথ গেমসসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। এসব আসরের আগে খেলোয়াড়, কোচ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সরাসরি ডোপিং সচেতনতা সেশন আয়োজন করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ভুল আর না ঘটে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে ওয়াডা শুধু খেলোয়াড় নয়, কোচ ও ম্যানেজারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়ে থাকে, ফলে সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশনও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ফেডারেশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, মাবিয়া দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এবং এই কঠিন সময়ে তাকে মানসিকভাবে সহায়তা দেয়া হবে। পাশাপাশি, নিষেধাজ্ঞা চলাকালেও তিনি যেন নিজের ফিটনেস ধরে রাখতে পারেন, সে জন্য এককভাবে অনুশীলনের সুযোগ করে দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ ও ২০১৯ সালে এসএ গেমসে টানা দুইবার স্বর্ণপদক জিতে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত দেশের নারী ক্রীড়ার এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তবে এই নিষেধাজ্ঞা তার ক্যারিয়ারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ডোপিং সচেতনতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির দিকটিও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

