নেত্রকোনাসহ সারা দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় ‘ইমার্জেন্সি এমআর (হাম-রুবেলা) টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬’ ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। রবিবার (১৯ এপ্রিল) নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাব হলরুমে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিসেফ (UNICEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং গ্যাভি (Gavi) এর সহায়তায় নেত্রকোনা সিভিল সার্জন কার্যালয় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন এবং টিকাদান কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন নেত্রকোনার সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম মাওলা। পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন নেত্রকোনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম মাওলা জেলার হাম পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে সাধারণত নয় মাস ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শিশুর বয়স নয় মাসের নিচে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুর বয়স দুই বছরের নিচে। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সরকার ছয় মাস থেকে শুরু করে ৫৯ মাস ২৯ দিন (৫ বছরের কম) বয়সী সব শিশুকে জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সিভিল সার্জন আরও জানান, দেশব্যাপী ১৮টি জেলার যে ৩০টি উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব (হটস্পট) দেখা দিয়েছে, সেখানে আগামী ৫ মে থেকে এই টিকাদান শুরু হবে। নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলা এই হটস্পটের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেখানে ৫ তারিখ থেকেই কার্যক্রম শুরু হবে। পরবর্তীতে ২০ মে থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সারা দেশের অবশিষ্ট সকল উপজেলায় ধাপে ধাপে (প্রথমে কমিউনিটি, তারপর পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশন এবং সবশেষে স্কুল পর্যায়ে) এই ক্যাম্পেইন চলবে। নেত্রকোনা জেলায় দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫২৬ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এক লাখ ৫৭ হাজার পাঁচশো ডোজ টিকা জেলায় এসে পৌঁছেছে এবং বাকি টিকা খুব শিগগিরই চলে আসবে। টিকাদান কার্যক্রম নিয়মিত ইপিআই (EPI) কেন্দ্রগুলোতে অনুষ্ঠিত হবে। জেলায় নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সদর হাসপাতালকে স্থায়ী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডের নিয়মিত অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রগুলোতেও ১১ কর্মদিবস ধরে টিকা দেওয়া হবে।
সিভিল সার্জন জানান, ছয় মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশুই এই ক্যাম্পেইনের আওতায় টিকা পাবে। যেসব শিশু ইতোমধ্যে হামের টিকা পেয়েছে, তাদের জন্য এই ডোজটি ‘বুস্টার ডোজ’ হিসেবে কাজ করবে। তবে, কোনো শিশু যদি গত ২৮ দিনের মধ্যে হামের টিকা পেয়ে থাকে, শুধুমাত্র তাদেরকেই এই ক্যাম্পেইনে টিকা দেওয়া হবে না। জেলায় স্বাস্থ্য সহকারীর প্রায় ১২০টি পদ শূন্য রয়েছে, যা টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে এই শূন্যতা পূরণে প্রতিটি কেন্দ্রে অন্তত একজন স্বাস্থ্য সহকারী বা পরিবার কল্যাণ সহকারী (FWA) এর পাশাপাশি ন্যূনতম দুজন করে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হবে।
ডা. মো. গোলাম মাওলা আরও জানান, নেত্রকোনা জেলায় এখন পর্যন্ত ২৫৯ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩০ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষায় আক্রান্তদের মধ্যে আটপাড়া উপজেলায় চার জন, দুর্গাপুরে তিন জন, কেন্দুয়ায় তিন জন, বারহাট্টায় একজন এবং মদন উপজেলায় একজন রয়েছেন। এ পর্যন্ত ১৩০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে ৮৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বর্তমানে সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। দুঃখজনকভাবে ইতোমধ্যে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসার জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার এবং নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রতিটিতে দুই-তিন শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী স্বাস্থ্য বিভাগের এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যই সবচেয়ে বড় নিয়ামত এবং সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এ কর্মসূচি সফল করতে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকর্মীরা জরুরি এই বার্তাটি প্রতিটি পরিবার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পরিশেষে, টিকাদান এ ক্যাম্পেইন শতভাগ সফল করতে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এসএমও (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) ডা. আবুল বাসার, নেত্রকোনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার দাউদ শরীফ ও ডা. দেবাশীষ সাহা, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসান কবির রিয়াদসহ জেলায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তারা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে ক্যাম্পেইন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করেন।
পড়ুন : বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে অংকুর সাহিত্য পাঠাগারে প্রতিযোগিতা


