বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নিয়মিত গণশুনানি কার্যক্রম ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। অসহায়, দরিদ্র ও বিপর্যস্ত মানুষ তাদের শেষ আশ্রয় হিসেবে ভিড় জমাচ্ছেন এই গণশুনানিতে—যেখানে শুধু অভিযোগ শোনা হয় না, তাৎক্ষণিক সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
মাত্র ১৫ দিনের শিশুসন্তানকে নিয়ে স্বামী পরিত্যক্তা সুরাইয়া বেগম হাজির হন গণশুনানিতে। জীবনসংগ্রামে দিশেহারা এই নারী সন্তানের চিকিৎসা ও লালন-পালনের জন্য সহায়তা চাইলে জেলা প্রশাসক তাকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন। বুধবার (২২ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত গণশুনানির এই দৃশ্য উপস্থিত সবার মনে মানবিক আবেদন সৃষ্টি করে।
একইভাবে আকবরশাহ থানার ফিরোজশাহ কলোনির বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার, যিনি কিডনি ও ক্যান্সারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত, তিনিও সহায়তা পান। স্বামী পরিত্যক্তা এই নারী শারীরিক দুর্বলতায় চাকরি হারিয়েছেন। দুই সন্তান—জিহাদুল ইসলাম ও আরাফাত ইসলামকে নিয়ে তার জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। তার আবেদন শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তা দেন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত চিকিৎসা সহায়তা আনার আশ্বাস দেন।
বন্দর এলাকার মোছাম্মৎ লাইজু বেগমও সন্তানের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে আসেন। দিনমজুর স্বামীর সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে সন্তানের চোখের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জেলা প্রশাসকের সহায়তায় তিনি আবারও চিকিৎসার আশা দেখছেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীর নাজমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগে ভুগছেন। স্বামী বার্ধক্যজনিত কারণে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালালেও চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। গণশুনানিতে আবেদন জানালে তাকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
মিরসরাই উপজেলার রেমন্ডু ফিলিপ রায় গুরুতর অসুস্থতায় একটি পা হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। তার একমাত্র সন্তান দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় থাকা এই ব্যক্তি সহায়তা চাইলে জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেন।
এছাড়াও সহায়তা পেয়েছেন ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বিধবা মাছুমা, হৃদরোগে আক্রান্ত বাঁশখালীর মাবিয়া খাতুন, স্বামীহারা ও শারীরিকভাবে অক্ষম নাহার, অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য আবেদনকারী আর্জিনা আক্তার এবং চট্টগ্রাম কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী, যার আর্থিক সংকটে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
গণশুনানিতে আসা আবেদনকারীরা জানান, জেলা প্রশাসক তাদের কথা ধৈর্য সহকারে শোনেন এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বুধবার আয়োজিত এই গণশুনানিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর থেকে আগত সেবাপ্রত্যাশীদের আবেদন ও অভিযোগ শোনা হয়। সর্বশেষ গণশুনানিতে ৭৪ জন সেবাপ্রত্যাশীর সমস্যা শোনা হয় এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ সময় ৯ জন অসুস্থ ব্যক্তি ও ১ জন শিক্ষার্থীকে নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৪৮ জন দুস্থ নারী-পুরুষের মধ্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়া গুঁড়া সম্বলিত ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এছাড়া কিছু আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি সেবাপ্রত্যাশীদের জানানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গণশুনানি কার্যক্রম এখন আর শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়—এটি ধীরে ধীরে মানুষের প্রত্যাশা ও নির্ভরতার জায়গায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে একজন মানবিক জেলা প্রশাসকের স্পর্শে বদলে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন।
পড়ুন: দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন
আর/


