সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সরবরাহকৃত বীজে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায়। প্যাকেটজাত বীজে একাধিক প্রজাতির সংমিশ্রণ থাকায় চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মাঠপর্যায়ে ফসলের বিপর্যয় স্পষ্ট হওয়ায় চরম ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কেন্দুয়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় দুই হাজার একশো টন। কৃষকদের মাঝে বিতরণকৃত ব্রী-৮৮ জাতের ধানের প্যাকেটে ব্রী-৮৯, ব্রী-৯২ এবং ব্রী-২৯ বীজের মিশ্রণ পাওয়া গেছে। ভেজাল এই বীজের কারণে অন্তত পাঁচশো টন ধানের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুর ১টায় নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা উজ্জ্বল সাহা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “বিএডিসির বীজে একাধিক জাতের সংমিশ্রণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং এ নিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদি (লং টাইম) ও স্বল্পমেয়াদি (শর্ট টাইম) জাতের বীজের মিশ্রণের কারণে সমস্যাটি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। একই জমিতে ধানের বৃদ্ধি ও পাকার সময় ভিন্ন হওয়ায় কৃষি ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
সরকারি বীজের এমন বেহাল দশায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। চিরাং ইউনিয়নের কৃষক তৌহিদ মিয়া হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা সরকারি বীজ ভেবে বেশি দামে কিনেছি। এখন দেখি এক জমিতে ধান পাকে দুই সময়ে। একবার কাটলে অর্ধেক ধান নষ্ট হয়, আর না কাটলে অন্য ধান জমিতেই ঝরে পড়ে যাবে। আমরা এখন কী করব?”
রোয়াইলবাড়ী এলাকার আরেক কৃষক শফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এভাবে চললে আমাদের পথে বসতে হবে। ঋণ করে চাষাবাদ করেছি, এখন ফলনই যদি ঠিকমতো না পাই, তাহলে সংসার চালাবো কীভাবে আর ঋণই বা শোধ করব কীভাবে?”
এ বিষয়ে একাধিক অনুমোদিত ডিলারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিএডিসি থেকে যে প্যাকেটজাত বীজ সরবরাহ করা হয়েছে, তারা শুধু সেটাই কৃষকদের কাছে বিক্রি করেছেন।
একজন ডিলার বলেন, “আমাদের হাতে যে বীজ এসেছে, আমরা সেটাই বিক্রি করেছি। প্যাকেটের ভেতরের বিষয়ে আমাদের কোনো হাত নেই। যদি বীজে সমস্যা থেকে থাকে, তবে তা উৎপাদন বা সরবরাহের উৎসেই হয়েছে।”
প্রাথমিক হিসেবে জানা গেছে, উপজেলার অন্তত এক হাজার ৫৪৫ জন কৃষক ইতোমধ্যে বীজ কেলেঙ্কারির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ৩৮২ হেক্টর জমিতে মিশ্র জাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি।
এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেন্দুয়া উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মহসিন তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “কৃষকদের সঙ্গে এমন প্রতারণা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।”
উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। তবে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ বা ক্ষতিপূরণের আশ্বাস না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
পড়ুন : ভোজ্য ও জ্বালানি তেল পাচাররোধ এবং কোরবানির ঈদ উপলক্ষ্যে বিজিবির বিশেষ কর্মসূচী গ্রহন


