রাজধানীর উত্তরায় সম্প্রতি বিভিন্ন বারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি নিয়ম-নীতি মেনে ব্যবসা পরিচালনা করার দাবি করলেও, অনেক ব্যবসায়ী এখন একটি অসাধু মহলের অনৈতিক দাবির মুখে জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযানের ধারাবাহিকতায় এই প্রভাবশালী মহলটি পরিস্থিতিকে পুঁজি করে অবৈধ সুবিধা আদায়ের অপতৎপরতা চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরে অবস্থিত অনুমোদিত বারগুলোতে নিয়মিত তদারকির নামে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স এবং ভ্যাট-ট্যাক্সসহ প্রয়োজনীয় সকল দাপ্তরিক বৈধতা থাকা সত্ত্বেও তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। মূলত অভিযানের ভয় দেখিয়ে একটি বিশেষ চক্র মোটা অঙ্কের মাসোহারা বা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরার একজন বার মালিক জানান, “আমরা সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ব্যবসা করছি। প্রতি মাসে সরকারকে সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রদান করে আসছে বৈধ লাইসেন্সধারী বার গুলো। কিন্তু অভিযানের পর থেকে কিছু লোক সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করছে। তারা বলছে, নির্দিষ্ট হারে সুবিধা না দিলে ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হবে। একদিকে অভিযানের আতঙ্ক, অন্যদিকে এই অসাধু মহলের চাপ—সব মিলিয়ে আমরা এখন জিম্মি।”
উত্তরার বারগুলোতে মূলত বিদেশি পর্যটক এবং লাইসেন্সধারী গ্রাহকদের সেবা প্রদান করা হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং নিয়ম মেনে চলে। এছাড়াও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়মিত নজরদারি থাকায় অনিয়ম থাকা বেশ কঠিন। তবে অসাধু মহলের এই ‘জিম্মি করার রাজনীতি’ কেবল ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং এই খাতের শৃঙ্খলাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, অপরাধ দমন বা অনিয়ম ঠেকাতে অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই অভিযানের আড়ালে যেন কোনো তৃতীয় পক্ষ লাভবান হওয়ার সুযোগ না পায়, সেদিকে প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি। এছাড়া মাদক বিরোধী অভিযানে সরকার তৎপর হলেই প্রশাসন লাইসেন্সধারী বারগুলিতে সহজেই অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে মিডিয়াতে পর্চার করে কিন্তু আসল সর্বনাশা মাদক – ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরইন, কোকেন এগুলির ব্যাবসায়ীরা দিব্বি রমরমা ব্যাবসা করে যাচ্ছে । ধরাছোঁয়ার বাইরে কিশোরগ্যাং, মাঝ থেকে ভুক্তভোগী হচ্ছে লাইসেন্সধারী বার ব্যাবসায়ীরা যারা দেশের রাজস্ব অর্জনের অন্যতম সহযোগী। স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনি কাঠামোর বাইরে কোনো ব্যবসায়ী যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সরজমিনে দেখা যায়, কম্বি বারে অভিযানের পর থেকেই উত্তরার কিছু সুবিধাবাদী লোক মব করার চেষ্টা করছে। তারা বারগুলির সরকার দ্বারা অনুমোদিত ব্যাবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার সময় বারের সামনে অবস্থান নিয়ে মানব বন্ধন, মাইকিং করে সরকারি অনুমোদিত / মহামান্য হাইকোর্ট এর নির্দেশে অনুমোদিত বারকে অবৈধ স্লোগান দিয়ে ব্যাবসায়িক কার্যক্রম কে বিঘ্নিত করছে। বাধা দিলে ব্যাবসায়িদের কে জবাই করে হত্যা করার হুমকি দিতেও দেখা গেছে কিছু গনমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে । অপর দিকে বেপরোয়া আচরন শুরু করেছে কিশোর গ্যাং এর চিন্হিত কিছু সন্ত্রাসী। ব্যাবসায়িরা বলেন এ সব কিশোর গ্যাং কে বারে প্রবেশ না করতে দিলে তারা বারের নিচে মব কৈরি করার চেষ্টা করে। এদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও অগ্গাত কারনে তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
এমতাবস্হায় উত্তরার কিছু বারে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রশাসনের অভিযান, গ্রেপ্তার, ও মব আতংকে বার গুলিতে গ্রাহক প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছে । মদ খাওয়ার পারমিটধারী একজন ব্যাবসায়ি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ) জানান – তিনি রপ্তানি পণ্যের গার্মেন্স ব্যাবসায়ী। নিয়মিতই তার বিদেশী বায়ার দের কে খুশি করতে বায়ারদের কে নিয়ে বারে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু অভিযানের দিন গনমাধ্যম অবাধ ভাবে বারে প্রবেশ করে পারমিটধারীদের কেও ভিডিও করে প্রকাশ করায় সামাজিক ভাবে তাদের হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে । এ জন্য ভয়ে তারা আর বারে প্রবেশ করছে না।
আরো একজন গ্রাহক অভিযোগ করেন- রেস্টুরেন্ট ও বারে মদ ছাড়া খাবারও বিক্রি করা হয়, তিনি খাবার খেতে গিয়ে মদ না খেয়েও প্রশাসনের হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন।
উল্লেখ্য, মদ বাংলাদেশের একটি আমদানি, রপ্তানি, উৎপাদন ও বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসাবে আইন আছে। মদ বিক্রয়ে সরকারি রাজস্ব অন্যান্য যে কোন পণ্যের চাইতে অনেক বেশি। মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত, মালদ্বীপসহ পৃথিবীর প্রায় সব মুসলিম দেশেই পর্যটন শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে এবং যুব সমাজকে ইয়াবা, আইস, কোকেন, হেরোয়িনসহ অন্যান্য মাদক থেকে রক্ষা করতে আ্যলকোহলকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও কখনই মদ নিষিদ্ধ পণ্য ছিলো না বরং কনট্রাব্যান্ড পণ্য হিসাবে চালু আছে যা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্তৃক কঠোর নজরদারিতে শুধুমাত্র অনুমোদিত বারগুলিতে পানযোগ্য। রাজস্ব অফিসে খোজ নিয়ে জানা যায় উত্তরার এই বার গুলি থেকে প্রতি মাসে বিপুলসংখ্যক রাজস্ব আদায় হয় । গত তিন অর্থবছরে যার পরিমান শতকোটি টাকারও বেশী। কিন্ত বিগত কিছুদিন অভিযান,গ্রেফতার ও মব আতংকে বএই শিল্প উত্তরাতে মুখ থুবরে পড়েছে, এতে সরকারি রাজস্ব হারানো, গার্মেন্টস শিল্পে প্রতিবন্ধকতা সহ উত্তরার বারগুলিতে চাকরিরত প্রায় ৫০০০ মানুষের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ।
উত্তরা এলাকায় স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ বজায় রাখতে এবং চাঁদাবাজ চক্রের অপতৎপরতা বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করেন, নিয়মের মধ্যে থাকা ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যেন কোনো অসাধু সিন্ডিকেট সরকারি ব্যবস্থার সুযোগ নিতে না পারে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

