নাটোরের বড়াইগ্রামে ১২ বছর আগে অস্ত্রধারীরা গুডুমশৈল ও মহিষভাঙ্গা গ্রামের পাঁচ যুবককে র্যাব পরিচয়ে সবার সামনে মারতে মারতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রায় ১২ বছর পরও কারো সন্ধান পায়নি তাঁদের পরিবার। এ ঘটনার পরের দিন বড়াইগ্রাম থানায় সাধারণ ডায়েরী করা হলেও পুলিশ আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও অপহৃতদের বাড়িতে আসেনি। এ ঘটনার পরে এলাকার মানুষ এখন আর রাতে ভয়ে বাহিরে যেতে চায় না। সবার মধ্যে বিরাজ করছে ভয় আর আতংক। অপহৃতদের মা-বাবা, স্ত্রী ও স্বজনেরা দিনের পর দিন অশ্রু ফেলে এখনো তাদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে। র্যাব বলেছে তারা এদের আটক করেনি। আর নাটোরের তৎকালীন পুলিশ সুপার সাংবাদিকের বলেছিলেন, তদন্তে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।
জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৯ মে রাত ১০টার দিকে তিনটি মাইক্রোবাসে নাটোরের বড়াইগ্রামের গুডুমশৈল ও মহিষভাঙ্গা গ্রাম থেকে র্যাবের পোষাক পড়ে এবং সিভিল পোষাকে র্যাব পরিচয়ে অস্ত্রধারি ১৩-১৪ জন লোক রাস্তা থেকে গুডুমশৈল গ্রামের রুহুল আমীনের ছেলে ইব্রাহিম খলিল (৩৫) ও শাহজাহানের ছেলে কামাল হোসেন (৩২) কে আটক করেন। রাইফেলের বাট দিয়ে মারতে মারতে তাদের মোবাইল কোম্পানীর প্রহরী সুমন আলীর বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে সুমনকে না পেয়ে তাঁর বাবা লস্কর প্রামাণিককে বাঁশের লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। স্ত্রী সন্তানদের সামনে নির্মমভাবে মারপিটের এক পর্যায়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান। লস্কর প্রামাণিক একজন হৃদরোগের রোগী, এ কথা জানানোর পর তাঁরা মারধর বন্ধ করে মহিষভাঙ্গা গ্রামের আবু বক্করের বাড়িতে গিয়ে তাঁর ছেলে তৈয়ব আলী (৩২) কে ধরে নিয়ে যায়। একই দিন বনপাড়া বাজারে যাওয়ার সময় তুলে নেয়া হয় কালিকাপুর গ্রামের বাড়িতে ছুটিতে আসা বিজিবি সদস্য গাজী ওমর ফারুকের ছেলে রাসেল গাজী এবং তার বন্ধু একই এলাকার কাটাশকুল গ্রামের আফতাব উদ্দিন মৃধার ছেলে কলেজ ছাত্র মো: সেন্টু হোসেনকে র্যাব পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরের দিন ২০ মে অপহৃত ইব্রাহিমের ভাই লোকমান তালুকদার সহ সবার পরিবারের পক্ষ থেকেই এ ব্যাপারে বড়াইগ্রাম থানায় জিডি করা হয়। আর মামলা করেন বিজিবি সদস্য রাসেল গাজীর পিতা গাজী ওমর ফারুক। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত পুলিশ ওই ঘটনা তদন্তে গ্রামে আসেনি। অপহৃত পাঁচ যুবকের পরিবার গত ১২ বছর ধরে র্যাবের নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী ও বাগমারা অফিসে বার বার গিয়েও তাঁদের কোন সন্ধান পাননি। থানা পুলিশও এ ব্যাপারে কোন তথ্য দিতে পারেনি। পরিবারের ধারণা তাঁদের গুম করা হয়েছে। তাদের সন্ধান পেতে পরিবারের লোকেরা দেশের বিভিন্ন কারাগারে গিয়েও তাদের খোঁজ পাননি।
নির্যাতনের শিকার লস্কর প্রমাণিকের বোন জুলেখা বেগম বলেন, ভাইকে মারতে নিষেধ করার কারণে ওরা আমাকেও রাইফেল দিয়ে তিনটা বাড়ি মারে। পরে অসুখের কথা শুনে মারা বন্ধ করে।

ইব্রাহিমের বাবা রুহুল আমীন বলেন, আমার ছেলে মাঠে কাজ করতো। কোনদিন কোন খারাপ কাজে দেখিনি। তাহলে র্যাব ধরে নিয়ে কেন গুম করে রেখেছে। হয় তারা ছেলেদের জেলখানায় দিক, না হলে ফিরায়ে দিক। মা সুফিয়া বেগম আর্তনাদ করে বলেন, ব্যাটার তিনটা ছেলে মেয়ে। ওদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গ্যাছে। কোলের ছেলেটা খালি বাপ বাপ করে কেঁদে বেড়ায়। আমরা আর সহ্যি করতে পারছি না। সরকার আমাদের মেরে ফেলুক না হলে ছেলেক ফেরত দিক।
অপহৃত তৈয়ব আলীর মা হাসিনা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে নিয়ে গেলো আজ পর্যন্ত পুলিশ র্যাব কোন হদিস দিতে পারছে না। আমি আমার ছেলের মা ডাক শুনতে চাই। সে বেঁচে না থাকলে তার লাশ চাই। এভাবে নাতীকে নিয়ে আর কষ্ট সইতে পারছি না। র্যাব ও পুলিশের কাছে কি এসব জীবনের কোন মূল্য নাই ?
কামাল হোসেনের বাবা শাহাজাহান বলেন, অপহরনের মাত্র এক বছর আগে ছেলেটাকে বিয়ে দিয়েছি। একটা বাচ্চাও হয়ছে। এখন ওদের নিয়ে কিভাবে চলবো, ভেবে পাচ্ছি না। সরকারের কেউ তো ফিরেও দেখে না। পুলিশ র্যাবও কিছুই করলো না। সরকারের কাছে তাদের পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবী দ্রুত নিখোঁজ এই পাঁচ যুবকের সন্ধান করে তাদের স্বজনদেও কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক।
অপহৃত রাসেল গাজীর পিতা গাজী ওমর ফারুক ও মা জুলেখা বিবি বলেন, তিন বছর ধরে বহু খুঁজেও ছেলেকে ফিরে পাইনি, সরকারের কাছে আমরা জানতে চাই আমাদের ছেলে এখন মৃত না জীবিত। সে কোন রাষ্ট্র বিরোধী কাজে জড়িত থাকলে তার বিচার করা হোক কিন্তু এভাবে পাঁচটি ছেলের গুম হয়ে থাকা আমাদের পক্ষে আর সর্হ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা সরকারের সহযোগীতা চাই, অবিলম্বে আমাদের ছেলেকে জীবিত বা মৃত ফিরে পেতে চাই। তারা কোথায় কি অবস্থায় আছে আমরা জানতে চাই।
কলেজ ছাত্র সেন্টু হোসেনের বৃদ্ধ পিতা আফতাব উদ্দিন মৃধা বলেন, আমার ছেলে অন্যায় করলে প্রয়োজনে আইনে আওতায় এনে বিচার করা হোক তবুও তার সন্ধান দেয়া হোক। তিনি তার ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানান।
নাটোরের পুলিশ মোহাম্মদ আমজাদ বলেছেন, যে পাঁচ জন আপহরন অথবা গুমরে অভিযোগটি পেয়েছি সেটা আমারা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছি। ইতিমধ্যে কিছু ক্লু আমাদের হাতে এসেছে সেগুলোকে যাচাই-বাছাই করেতেছি। অনেকগুলো বিষয়কে সামনে রেখে এটাকে তদন্তের পর্যায়ের নেওয়ার চেষ্টা করছি। কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে এদেরকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে কি না অথবা ব্যক্তিগত বিরোধের ঘটনা সামনে আসছে সেটাও তদন্তের মধ্য রাখছি বিবেচনায় আছে। পুলিশ অথবা র্যাবের কোন সদস্য জড়িত ছিল কিনা সেই সময় নথিপত্র পর্যালোচনা দেখব আমাদের কোন সদস্যের উপস্থিতি সেখানে ছিল কি না। সেটা যদি থাকে তার যেখানেই পোস্টিং হোক তাকে বিভাগীয় ব্যবস্থার আওতায় এনে ব্যবস্থা করব। আমরা আশা করছি যে বর্তমান পরিবর্তিত সময়ে এরকম নেক্কারজনক ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে শীঘ্রই এটা তদন্ত করে বের করা হবে।


