বসতঘর নির্মাণের জন্য মাটি খনন করার সময় পুরোনো একটি ঘরের দেয়াল ও প্রাচীন কাঠামোর অংশবিশেষ পাওয়া যায়।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বারপাড়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের ধর্মপুর গ্রামে (চারা বাড়ি) মাটি খননের সময় এই পুরাকীর্তির সন্ধান পায় ওই জমির মালিক। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
প্রত্নস্থলটি এক নজর দেখার জন্য প্রতিদিন ভিড় করছেন কৌতূহলী মানুষ। গত শনিবার (৩ মে) থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত ও খনন কাজ শুরু করেছে। তাদের তত্ত্বাবধানে চলছে নিদর্শন উদ্ধারের কাজ। লালমাই পাহাড়ে আবারও খোঁজ মিলতে শুরু করেছে প্রাচীন সভ্যতার।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক দপ্তর, কুমিল্লার একটি প্রত্নতাত্ত্বিক টিম বালাগাজী মুড়ায় খনন ও অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা করছে। আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোছা. নাহিদ সুলতানার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সাত সদস্যের খনন টিমে আরও আছেন ফিল্ড অফিসার মো. আবু সাইদ ইনাম তানভীর, ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মো. শাহীন আলম, গবেষণা সহকারী মো. ওমর ফারুক, সার্ভেয়ার চাইথোয়াই মার্মা, ফটোগ্রাফার শঙ্খনীল দাশ এবং পটারী রেকর্ডার রিপন মিয়া।
ধারণা করা হচ্ছে, এটি বহু পুরোনো কোনো রাজা বা জমিদার আমলের স্থাপনার অংশ হতে পারে। তবে চূড়ান্ত তথ্য নিশ্চিত হতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিশ্লেষণ ও গবেষণা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ১০ থেকে ১২ একর এলাকাজুড়ে খনন কার্যপরিচালনা করা গেলে শালবন বিহার, আনন্দ বিহার কিংবা রূপবান মূড়ার মত আরো একটি নিদর্শন উন্মোচিত হতে পারে। এমনকি ব্যাতিক্রমী কোন নিদর্শন পাবারও সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছে, শালবন বৌদ্ধ বিহারের দক্ষিণে এই প্রথম কোন প্রত্নক্ষেত্র পাওয়া গেলো। খ্রিষ্টীয় ৭ম-৮ম শতাব্দীর কুমিল্লা ময়নামতি অঞ্চলে পট্টিকেরা জনপদের অংশও হতে পারে এটি। পট্টিকেরা সমতটের পাঁচটি রাজধানীর একটি ছিলো। বিভিন্ন সময় প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই অঞ্চলে পট্টিকেরা-এর বিষয়ে উল্লেখ করলেও তার নিদর্শন উন্মুক্ত হয়নি।
কুমিল্লা ময়নামতি যাদুঘরের কাস্টোডিয়ান ও খননকার্য পরিচালনার সদস্য মোঃ শাহীন আলম জানান, ‘পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বড় বড় ইট দিয়ে তৈরি প্রায় ছয় ফুট চওড়া প্রাচীন একটি দেয়ালের অংশবিশেষ উন্মোচিত হয়েছে, যা হয়তো কোনো স্থাপনার কর্ণার। খননকালে মৃৎপাত্রের ভগ্ন টুকরোবিশিষ্ট তিন চার ফুট পুরো একাধিক মাটির স্তর সরানোর পরে সন্ধান মেলে প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্যবাহী দেয়ালের এ ধ্বংসাবশেষ।’

বালাগাজীর মুড়া নামে পরিচিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটিতে উন্মোচিত প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ লালমাই ময়নামতিতে আবিষ্কৃত হাজার বছর আগের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ভোজ বিহার, ইটাখোলা ও রূপবান মুড়ার প্রাচীন মন্দির ও বিহারের ধ্বংসাবশেষের সমসাময়িক হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও অনুসন্ধান টিম।’
টিমের অন্যতম সদস্য মো. শাহীন আলম আরো বলেন, ‘বালাগাজীর মুড়ায় মাত্রই তো খনন ও অনুসন্ধান কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রকৃত সময় সম্পূর্ণ খনন ও গবেষণা কাজ সম্পন্ন করার পরে জানা যাবে। বালাগাজীর মুড়া স্থানীয়দের কাছে চারা বাড়ি নামে সুপরিচিত। মূলতো এ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির উপরিভাগে প্রচুর চারা অর্থাৎ মৃৎপাত্রের ভগ্ন টুকরো থাকায় স্থানীয়ভাবে এ নামকরণ হয়।
খনন ও অনুসন্ধান কাজের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফিল্ড অফিসার) মো. আবু সাইদ ইনাম তানভীর জানান, ‘চলতি এপ্রিল ২০২৫ মাসের প্রথম দিক থেকে বালাগাজীর মুড়ায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও অনুসন্ধান কাজ শুরু করা হয়েছে, যা আগামী জুন ২০২৫ মাস পর্যন্ত চলবে।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোছা. নাহিদ সুলতানা বলেন, ‘প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে বালাগাজীর মুড়াকে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ঘোষণা করা হয়, যা ১৯৪৫ সালের শিমলা গেজেটে প্রকাশ করা হয়। নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সাবিনা আলম এর অনুমোদন ও নির্দেশনা নিয়ে এ বছর কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলায় অবস্থিত বালাগাজীর মুড়ায় খনন ও অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।’
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়ছার জানান, কুমিল্লার লালমাই বৌদ্ধ বিহারের মতো এখানেও প্রত্নতত্ত্বের সন্ধান মিলেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের লোকজন খনন কাজ চালাচ্ছে। খনন কাজের মধ্যে এর পরিধি বুঝা যাবে। এখানে আরেকটি প্রত্নতত্ত্ব সাইট উম্মোক্ত হবে আশা করছি।


