দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের পর এবার ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে দখলদার ইসরায়েল। সোমবার (৫ মে) এক ভিডিও বার্তায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানান, গাজায় সেনাবাহিনীর দখলে থাকা এলাকাগুলো থেকে ইসরায়েলি বাহিনী আর সরে যাবে না। বরং সেখানেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
নেতানিয়াহুর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসরায়েল কেবলমাত্র হামাসকে দমন নয়, বরং পুরো গাজা উপত্যকাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, এখন পর্যন্ত গাজার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এসব এলাকায় গাজাবাসীদের সরিয়ে দিয়ে নির্মিত হচ্ছে নজরদারি চৌকি ও ওয়াচ টাওয়ার। এই অঞ্চলগুলোকে ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ হিসেবে অভিহিত করছে ইসরায়েল।
রবিবার ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজায় সামরিক অভিযান আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। পরিকল্পনায় বলা হয়, গাজার দক্ষিণে রাফাহ শহর পর্যন্ত নতুন করে অভিযান চালানো হবে এবং বাসিন্দাদের সেখানেই সরিয়ে নেওয়া হবে। এই সময় খাদ্য ও ত্রাণ সহায়তা সরবরাহের কাজ একটি বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হবে, তবে ইসরায়েলি সেনারা সরাসরি এতে যুক্ত থাকবে না।
গাজার বাসিন্দারা ইতোমধ্যেই ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং খাদ্য, ওষুধ, পানি ও বিদ্যুৎ সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। গাজার আয়তন মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার হলেও, বর্তমানে এর প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকাজুড়ে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতি রয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলের পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। তারা এটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নজির হিসেবে উল্লেখ করেছে। হামাসও ইসরায়েলের এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, গাজার ত্রাণ সহায়তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে হতে হবে, না হলে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
ইসরায়েলের চিফ অব স্টাফ ইয়াল আজমির জানান, গাজায় হামলা জোরদার করতে হাজার হাজার রিজার্ভ সেনা ডাকা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা হামাসকে পরাজিত করতেই এই পদক্ষেপ নিচ্ছি এবং যতদিন না সব জিম্মি মুক্ত হচ্ছে, ততদিন আমাদের অভিযান চলবে।”
এদিকে, বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক পরিকল্পনা অনুসরণ করছেন, যার আওতায় গাজার ফিলিস্তিনি জনগণকে দক্ষিণাঞ্চলে সরিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল গড়ে তোলা হবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর থেকেই গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। সেই হামলায় ১২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে চলমান অভিযানে গাজায় ৫২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী, শিশু ও বয়স্ক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজায় ইসরায়েলের স্থায়ী উপস্থিতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করবে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের পথ তৈরি করবে।
পড়ুন: গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত আরও ৫৪ ফিলিস্তিনি
দেখুন: বেস্ট থ্রি: আজকের বিশ্বের সারাদিনের সেরা খবর |
ইম/


