চাঁদপুর শহরে সুজন তালুকদার নামে এক জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে কাগজে কলমে মৃত দেখিয়ে বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ অন্যান্য নগদ অর্থের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে আসছেন প্রতারক স্ত্রী অসীমা তালুকদার। শুধু তাই নয় ইতিমধ্যেই সুজন তালুকদার নামের এই জীবিত মুক্তিযোদ্ধার নামে ব্যাংকে আসা পুরো ভাতার টাকা তিনি উত্তোলন করে নিজের নামে আত্মসাৎ করে অন্যান্য মাধ্যমে নেয়ার অভিযোগ তার স্বজনদের।
৭ মে বুধবার চাঁদপুর শহরের চিত্রলেখার মোড়ের সোনালী ব্যাংক হতে সুজন তালুকদার নামে মৃত মুক্তিযোদ্ধার ভাতার তথ্য পাওয়া যায়। তথ্য নিশ্চিত করেন ব্যাংকটির সিনিয়র অফিসার মাহবুব আলম।
তিনি জানান, আমাদের এখানে সুজন তালুকদারসহ মোট ৩৯৫ জন মৃত মুক্তিযোদ্ধার ওয়ারিশরা নিয়মিত ভাতা তুলছেন। যারা মাসে ২০ হাজার টাকা, এর সাথে দুই ঈদে ১০ হাজার করে ঈদ ভাতা এবং বৈশাখী ভাতা হিসেবে সবাইকে আরও ২ হাজার টাকা করে সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আমাদের এ শাখায় মোট মুক্তিযোদ্ধা ৭২৬ জন।এরমধ্যে জীবিত মুক্তিযোদ্ধা ৩৩১ জন। জীবিতদের প্রত্যেককে বিজয় দিবসে ৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। তবে মৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ওয়ারিশ বেশি হওয়ায় মোট উপকারভোগী এখানে ৯৫৭ জন। তবে সুজন তালুকদারের অর্থ একমাত্র ওয়ারিশ হিসেবে তার স্ত্রী অসীমা তালুকদারই তুলছেন।
এদিকে সরকারি ওয়েব সাইটে বীর মুক্তিযোদ্ধা তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে দেখা যায়, সুজন তালুকদারের মুক্তিযোদ্ধার নম্বর হচ্ছে ০১১৩০০০১৬০২ এবং বেসামরিক গেজেট ৫৫ এবং লাল মুক্তিবার্তা ০২০৫০১০২৭০। তার পিতা হচ্ছেন মৃত হরে কৃষ্ণ তালুকদার এবং ঠিকানা হচ্ছে গ্রাম-৬৬, মেথা রোড, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর। সেখানেও তাকে মৃত উল্লেখ করে রাখা হয়েছে।
এ তথ্য অনুযায়ী সেখানে গেলে মুক্তিযোদ্ধা সুজন তালুকদারকে পাওয়া না গেলেও তার নিকট আত্মীয়দের পাওয়া যায়। তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে মুক্তিযোদ্ধা সুজন তালুকদার এক সময় প্রবাসে আমেরিকায় ছিলেন। আর এই দুরুত্বে তার স্ত্রী অসীমা জড়িয়ে পড়েন পরকিয়াসহ নানান অসামাজিক অপকর্মে। অর্থ বিলাসি অসীমা তার স্বামীর প্রবাস থেকে পাঠানো পুরো টাকা পরকিয়া প্রেমিকসহ উচ্চ বিলাসিদের পেছনে খরছ করছেন এবং নামে বেনামে অন্যত্র গচ্ছিত রেখেছেন বলে ধারণা তার নিকট আত্মীয়দের।
মুক্তিযোদ্ধা সুজন তালুকদারের বৌদি কল্পনা তালুকদার জানান, অসীমার পরকিয়াসহ অপকর্মের বেশকিছু তথ্য প্রমাণ তার ফোনের মেসেন্জার থেকেও পেয়েছি। স্বামী মুক্তিযোদ্ধা সুজন তালুকদার এসবের প্রতিবাদ করায় নানা সময়ে তাকে মারধরসহ ভাড়া বাসায় বেঁধে রাখার খবর পাচ্ছি। এখন সুজনকে নিরাপত্তা দিতে প্রয়োজনে আমাদের জিম্মায় চাইলে প্রশাসন তুলে দিতে পারে।
মুক্তিযোদ্ধা সুজন তালুকদারের ভাতিজি বিপাশা তালুকদার বলেন, কাগজে কলমে ত ওনাকে(সুজনকে) মেরেই ফেলা হয়েছে। তাই তাকে বাসায় গৃহবন্ধী করে রাখে। বিষয়টি কাউকে না জানাতেই তিনি(অসীমা) আলাদা ভাড়া বাসায় থাকেন। এখন টার্গেট ওনার(সুজনের) যে সম্পত্তি রয়েছে তা ভোগ করতে ওনাকে মেরে ফেলতে ওনি চাঁদপুর শহর ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। যেকোন সময় ওনি ওনার পরকীয়া প্রেমিকরা মিলে ওনাকে(সুজনকে) মেরে ফেলার আশঙ্কা করছি। আমরা এই লোভী প্রতারক অসীমার বিচার দাবী করছি।
এমন খবরে সুজন তালুকদারের মিশন রোডের ভাড়া বাসায় গেলে সাংবাদিক দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বয়সের ভাড়ে নুয়িয়ে পড়া মুক্তিযোদ্ধা সুজন তালুকদার ভয়ে ভয়ে বলেন, আমাকে এই খাটে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে মারে। সবসময় ধমকায় ও শাশায়।
বাড়ির মালিক চন্দনা রায় বলেন, জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি জানলে অসীমাকে বাড়ী ভাড়াই দিতাম না কখনো। ওনি যে বাসায় এগুলো করে তা ত কখনোই জানতাম না। এজন্যই দেখি ওনি বাসার বাইরে গেলে তার স্বামীকে কখনও বাইরে নেন না।
এমন খবর চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধা অঙ্গণে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন জীবিত অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধা বিনয় ভূষণ মজুমদার, মোঃ আমিনুর, বাসুদেব মজুমদারসহ অন্যরা বলেন, বছরের পর বছর এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে জীবিত সুজনের অর্থ তাকে মৃত দেখিয়ে উত্তোলন পুরোপুরি বে-আইনি। অসীমাকেসহ এ বেআইনী কাজে যারা তাকে সহায়তা করেছে তাদেরকেও তদন্ত সাপেক্ষে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি পুরো টাকা অসীমাকে ফেরতপূর্বক রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার দাবী জানাচ্ছি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ উত্তোলন করেও বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই অসীমা তালুকদারের। তিনি জানান, আমার চোখের চিকিৎসার প্রয়োজন। তাই দ্রুত সুজনকে নিয়ে এ জেলা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবো। আমার বোন জামাই আছে ঢাকায় এবং মেয়ে জামাই আছে এক স্থানে। তারা ঢাকায় অসুস্থ্য সুজনকে দেখবাল করবে। এসময় তিনি সুজনের অর্থ কোথায় লাপাত্তা করেছেন তার কোন উত্তর দেননি। তবে সব টাকা সুজনের চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন বলে দায় এড়াতে চেয়েছেন।
এমন খবর জানা মাত্র অবিলম্বে এই প্রতারক অসীমার থেকে পুরো অর্থ ফেরত এনে তা জুলাই আন্দোলনে আহত নিহতদের জন্য ব্যয়ের দাবী তোলেন চাঁদপুরের এনসিপি নেতা মোঃ তামিম খান। তিনি বলেন, জুলাই গণ অভ্যুত্থানে আহত নিহতদের স্বজনরা এখনো অসহায়। অতছ প্রকারকরা নানা কৌশলে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুফ করছে। এরসাথে যারা যারা জড়িত তাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার দাবী জানাচ্ছি।
এসব তথ্য চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিনকে অবগত করলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও রাষ্ট্রের সাথে এই প্রতারণার তথ্য সঠিক হলে তদন্তপূর্বক ওই ভাতা বন্ধসহ সাংবাদিককে বড় রকমের পুরুষ্কার দেয়ার ঘোষণা দেন।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, প্রতারকের প্রতি আমাদের কোন প্রকারের অনুশোচনা কাজ করার সুযোগ নেই। তথ্য প্রমাণ সঠিক হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এদিকে ধূর্ত্য প্রতারক অসীমা তালুকদার যাতে চাঁদপুর ছেড়ে পালাতে না পারে এবং তাকে শাস্তি প্রদানসহ তার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন সুধীমহল।
পড়ুন: চাঁদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১, আহত ৮
দেখুন: চাঁদপুরে চকলেটের লোভ দেখিয়ে শিশু অ*প*হ*র*ণে*র সময় আটক |
ইম/


