ঘনকালো মেঘে ঢাকা আকাশ। কখনো ঝুমবৃষ্টি কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি,কখনো আবার বিরামহীন বয়ে চলছিল দমকা হাওয়া-এসব কিছুই বাধ সাধেনি। এভারেস্টের চূড়ায় লাল সবুজের পাতাকা উড়িয়ে ইকরামুল হাসান শাকিল নিজ জন্ম ভিটায় ফিরে আসার খবরে আশেপাশের সব গ্রামের মানুষ ছুটে এসেছিলেন তার কুটিরে। কারো হাতে তাজা ফুলের তোড়া, কারো হাতে মালা। কেউ আবার নিয়ে এসেছিলেন মৌসুমী নানা ফল। অগণিত মানুষের সঙ্গে জ্যৈষ্ঠের প্রকৃতিও যেনো দলবেধে ছুটে এসেছিল এভারেস্ট জয়ী ইকরামুল হাসান শাকিলকে স্বাগতম জানাতে।
গতকাল শনিবার দুপুরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এ দৃশ্য। এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণের ১০ পর গত বৃহস্পতিবার বিকেলে দেশে ফিরে আসেন শাকিল। ঢাকায় দু’দিন বিশ্রামের পর গতকাল শনিবার সকালে তার জন্ম ভিটায় ছুটে যান। এ খবরে বাগচালা ও আশেপাশের সব গ্রামের হাজারো মানুষ ছুটে আসেন শাকিলকে শুভেচ্ছা জানাতে। এলাকাবাসীর বিরল এ ভালোবাসা পেয়ে শাকিল আপ্লুত হয়ে পড়েন। ঢাকা থেকে মাওনা চৌরাস্তা হয়ে ফুলবাড়িয়া রোড দিয়ে শালদহ ব্রীজ পার হয়ে বাগচালা গ্রামে পৌঁছার পর বাবাহারা শাকিল তার মা শিরীন আক্তারকে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চার দিক ফুলের বৃষ্টি ঝরিয়ে তাকে স্বাগতম জানান এলাকার মানুষ।
ইকরামুল হাসান শাকিল বলেন, ‘ গ্রামের মানুষ আমাকে বিরল ভালোবাসা দিয়েছে। আমাকে আপ্লুত করেছে। আমাকে ঋণী করে ফেলেছে। আমাকে দায়বদ্ধ করে ফেলেছে। কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আমার আর কিছুই দেওয়ার নেই। বাবা বেঁচে থাকলে আজকে অনেক খুশি হতেন। বাবাকে খুব মিস করছি।’ শাকিলের বন্ধু এবি সিদ্দিক বলেন, শাকিল এখন পুরো দেশের গর্ব। আমরা গর্বিত শাকিলের জন্য। আমাদের গ্রামকে মানুষ চিনে শাকিলের কারণে।
নেপাল ও চীনের তীব্বত স্বায়িত্বশাসিত এলাকার সীমান্তে সর্বোচ্চ পবর্তশৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়ায় লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে সপ্তম বাংলাদেশী হিসেবে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন ইকরামুল হাসান শাকিল। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার উচ্চতায় হিমালয় পর্বতমালার প্রধান শৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়ায় গত ১৯ মে নেপালের স্থানীয় সময় সকাল ৬ টা ৩০ মিনিটে পৌঁছান তিনি। এভারেস্ট জয়ের লক্ষ্যে শাকিল গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ইনানী বিচ থেকে হাঁটতে শুরু করেন। পায়ে হেঁটে ৮৪দিনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এভারেস্ট চূড়া স্পর্শ করেন। দেশে ফিরে আসেন বৃহস্পতিবার বিকেলে।
ইকরামুল হাসান শাকিল বলেন, সর্বোচ্চ পবর্তশৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে লাল সবুজের পাতাকা হাতে নিয়ে আমি কেঁদেছি। এই কান্না ছিল কৃতজ্ঞতার, আনন্দের আর দায়িত্ববোধের। এ পথ সহজ ছিল না।
অভিযানের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, হিমালয়ের অতল গভীর বরফের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে আমাদের জীবনবিন্দু। যমুনা নদীর উত্তাল খরস্রোতা ঢেউ, অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ, খুম্বু আইসফল, লোৎসে ফেস, সাউথ কল, হিলারি স্টেপ একেকটা জায়গা যেন একেকটা মানসিক যুদ্ধক্ষেত্র ও মৃত্যুর চোখ রাঙানি। অক্সিজেনশূন্য উচ্চতায় কৃত্রিম অক্সিজেন মাস্কবদ্ধ মুখে প্রতিবারই মনে হয়েছে, ‘আর পেরে উঠবো না।’ কিন্তু হৃদয়ে বাজতে থাকা বাংলাদেশের নাম আর ‘সি টু সামিট’ অভিযানের অঙ্গীকার আমাকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।
তিনি বলেন, আমি তখন দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে। মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায়। মাথার ওপরে বিশুদ্ধ নীল আকাশ থাকার কথা ছিল কিন্তু প্রকৃতি সেটা চায়নি। চেয়েছিল চরম পরীক্ষা। পায়ের নিচে ছিল অসীম শূন্যতা। ৮৮৪৮.৮৬ মিটার ওপরে দাঁড়িয়ে আমি শুধু একজন পর্বতারোহী নই- আমি তখন হাজারো আবেগ, ত্যাগ, সংগ্রাম আর স্বপ্নের প্রতিনিধি।’ শাকিলের ‘সি টু সামিট ’ নামের এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পর্বতশিখর পর্যন্ত এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, ‘ পৃথিবী আমাদের, আমাদেরই দায়িত্ব প্লাস্টিক দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে টিকিয়ে রাখা আমাদের ভবিষ্যৎ।’
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাগচালা গ্রামের প্রয়াত খবির উদ্দিন ও শিরিন আক্তার দম্পতির ৩ ছেলের মধ্যে ইকরামুল হাসান শাকিল প্রথম। কাব্য সাধনা দিয়ে তার স্কুল জীবন শুরু হলেও পরবর্তীতে পাহাড় পর্বতের চূড়া স্পর্শ করার নেশা পেয়ে বসে তাকে।
ভারতের নেহেরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিংয়ে পর্বতারোহণের প্রাথমিক ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়া শাকিল এর আগেও আরোহণ করেছেন, গ্রেট হিমালয়,৬ হাজার ১৮৬ মিটার উঁচুর মাউন্ট কায়াজো রি পর্বত,৭ হাজার ১২৭ মিটার উঁচুর হিমলুং, ৬ হাজার ৩৩২ মিটারের দোলমা খাংসহ বেশ কিছু পর্বত।
পড়ুন: গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে ডাকাতি
দেখুন: গাজীপুরে বনবিভাগের প্রায় ১২ হাজার একর জমি বেদখল
এস

