রাতের আঁধারে এক নারীকে হাত-পা বেঁধে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। এই ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসময় কেঁদে কেঁদে ওই নারী চিৎকার করে বলছেন- ‘আমারে বাঁচা, বাঁচা আমারে, আমারে একটু বাঁচা।’
শনিবার মধ্যরাতে ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবি ইউনিয়নের মাঝের দেওর গ্রামে। পুলিশ বলছে, এটি পারিবারিক ঘটনা।
শনিবার রাত দেড়টার দিকে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করেন ওই ইউনিয়নের মাঝের দেওর গ্রামের মৃত কাসেম গাজীর ছেলে কামাল গাজী। যা মুহূর্তেই দেশজুড়ে ভাইরাল হয়। ভাইরাল ওই ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি দাবি করেন-ভিডিওতে যাকে তুলে নেওয়া হচ্ছে, তিনি তার স্ত্রী।
ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘আমার বাড়িতে গিয়ে আমার কলিজা বউকে এভাবে মারতে মারতে হাত-পা বেঁধে নিয়ে গেছে একটু আগে। দেশবাসীর কাছে সহযোগিতা কামনা করছি। আমার কলিজাটাকে বাঁচান।’ এরআগে এ ঘটনায় বিএনপির লোকজনকে দায়ী করে আরেকটি পোস্ট করেছিলেন কামাল গাজী। যে কারণে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় এবং ঘটনাটি রাজনৈতিক ইস্যুতে মোড় নিচ্ছিল। পরে এটি যে পারিবারিক ইস্যু-তা জানাজানি হলে সেই পোস্ট ডিলেট করেন দেন কামাল। কিন্তু ভিডিওসহ তার দেয়া পরবর্তী পোস্টটি মূল আলোচনায় এসেছে। রোববার দুপুর ১ টার পর্যন্ত ওই ভিডিওটি ৮ মিলিয়ন ভিউ হয়েছে।
জানা গেছে, ঘটনার সময় কামাল গাজী নিজ বাড়িতে ছিলেন না। পুলিশ জানায়, ভিডিওতে দেখা যাওয়া নারীর নাম উম্মে সুলতানা তন্বী, তিনি একই ইউনিয়নের বাইলাবুনিয়া গ্রামের শাখাওয়াত হাওলাদারের মেয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামাল গাজী এবং ওই মেয়ের পরিবার দুই পক্ষ দুই মেরুর রাজনীতি করে। তন্বীর পরিবার স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, আর কামাল গাজী নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের রাঙ্গাবালী উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি।
রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমারৎ হোসেন বলেন, ‘তদন্তে জানা গেছে-কামাল গাজীর সঙ্গে ওই মেয়ের গোপনে বিয়ে হয়েছে নাকি। প্রেমের সম্পর্ক থেকেই এই বিয়ে হয়েছে এমনটা শোনা যাচ্ছে। তবে বিয়ের কোন ডকুমেন্টস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় এক সপ্তাহ আগে তন্বী স্বেচ্ছায় কামালের বাড়িতে এসে অবস্থান করছিলেন। তবে ৫ জুনের পর কামাল নিজেই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ।’
ওসি আরও বলেন, ‘শনিবার রাতে তন্বীকে তার বাবাসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য জোরপূর্বক নিয়ে যান। এসময় উপস্থিত ছিলেন তন্বীর বাবা শাখাওয়াত, চাচা ছাত্তার হাওলাদার, মামা জাহিদসহ আরও কয়েকজন। এদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত লিটু গাজী, মোহসীন হাওলাদার, এরশাদ এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য (মৌডুবি ৯ নম্বর ওয়ার্ড) ইলিয়াস গাজী ছিলেন। তবে এটি কোন রাজনৈতিক ইস্যু নয়, পারিবারিক ঘটনা। এখনো কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
রোববার সকালে ফেসবুকে আরেকটি পোস্ট দিয়ে কামাল গাজী বলেন, এখন পর্যন্ত তিনি কোন সহযোগিতা পাননি। রাতে তার বাড়িতে গিয়ে যারা তার মা-বোনকে মারধর করে তার স্ত্রীকে নিয়ে গেছে তাদের পরিচয় তিনি জানিয়েছেন। তারা হলেন-শাখাওয়াত (স্ত্রীর বাবা), ছত্তার (স্ত্রীর চাচা) ও এশশাদ।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তন্বীর বাবা শাখাওয়াত হাওলাদার বলেন, ‘আমার পদ-পদবী নেই। কিন্তু আমি বিএনপির রাজনীতি করি৷ রাত ১২টার দিকে স্থানীয় ইউপি সদস্য ইলিয়াস গাজীর উপস্থিতিতে ছেলের পরিবার আমাদের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়েছে। বিয়ের কোন কাগজপত্র নেই। আমি পটুয়াখালী নোটারী পাবলিকের সব উকিলের কাছে গিয়ে খোজাখুজি করেছি। ছেলে ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় নেই। এভাবে মেয়ে গিয়ে আরেকজনের বাড়িতে উঠে থাকায় আমাদের সম্মানহানি হচ্ছিল। তাই আমরা গিয়ে নিয়ে আসছি। কাউকে মারধরের কোন ঘটনা ঘটেনি। আমি বলেছি, ছেলে যদি এসে কাগজপত্র দেখাতে পারে তখন আমরা মেয়েকে দিয়ে দিবো।’
জানা গেছে, ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গোপন বিয়ে এবং সামাজিক সম্মানের দ্বন্দ্ব-সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন নানা মাত্রায় আলোচিত।
উপজেলার মৌডুবি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘১০-১২ দিন আগে কামাল গাজীর স্ত্রী পরিচয়ে কামালের বাবার বাড়িতে এসে অবস্থান করে তন্বী নামের মেয়েটি। তবে তাদের মধ্যে যে বিয়ে হয়েছে, এমন কোন তথ্য এলাকার কারও কাছে নেই বলে স্থানীয় ইউপি সদস্য আমাকে নিশ্চিত করেছে। কিন্তু মেয়ে নাকি দাবি করেছে তাদের কোর্ট ম্যারেজ হয়েছে। কিন্তু কোন প্রমাণ দেখাতে পারেনি। শনিবার রাতে পরিবারের লোকজন এসে কামালের বাড়ি থেকে তন্বীকে জোরপূর্বক নিয়ে যায়৷ মেয়ে যেতে চাচ্ছিল না বলে জানতে পেরেছি। তবে মেয়ে যদি প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে থাকে এবং বিয়ে যদি সঠিক হয়ে থাকে- তাহলে এভাবে জোরপূর্বক নেওয়া ফৌজদারি অপরাধ।’
এনএ/


