উন্নয়নমূলক কাজে ঠিকাদারদের কাছ থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য বা রাজনৈতিক নেতাদের ‘পার্সেন্টেজ’ (কমিশন) নেওয়ার দীর্ঘদিনের অপসংস্কৃতি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। একইসঙ্গে তিনি উন্নয়নকাজে বিন্দুমাত্র অনিয়ম ও দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিকেলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় খাল খনন প্রকল্প পরিদর্শন শেষে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পের আওতায় কলমাকান্দার রংছাতি ইউনিয়নের তেরতোপা সাহাব উদ্দিনের বাড়ী থেকে বড় ঝরিয়া নদী পর্যন্ত দুই হাজার চারশো মিটার খাল খনন প্রকল্প পরিদর্শনের আয়োজন করে উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।
সমাবেশের শুরুতে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের ‘ডাক্তার’ এবং নিজেকে জনগণের নির্বাচিত ‘সেবক’ বা নার্স হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “হাসপাতালে ডাক্তার যেমন অপারেশন করেন এবং ব্যবস্থাপত্র দেন, আর সেবক বা নার্স যেমন রোগীর ওষুধ খাওয়া ও মানসিক শান্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন, তেমনি প্রশাসন এখানে ডাক্তারের ভূমিকায় আর আমি আপনাদের সেবক। আর আপনারা জনগণ হলেন আমাদের মূল ফোকাস। কর্মকর্তারা রোগ নির্ণয় করে কাজ করবেন, আর আমি আপনাদের সেবক হিসেবে তা নিশ্চিত করব।”
দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ডেপুটি স্পিকার। তিনি তার প্রয়াত বাবার কথা স্মরণ করে বলেন, “আমার বাবা মৃত্যুর আগে আমাকে ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন- ‘যেহেতু রাজনীতি করো, জীবনে কখনো দুর্নীতি করতে পারবে না।’ ধর্মীয় বিধান মতে এই ওসিয়ত পালন করা ওয়াজিব। তাই বাবার নির্দেশ অনুযায়ী আমি যেমন দুর্নীতি করব না, তেমনি কাউকে দুর্নীতি করতে দেবও না।”
তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমাদের নেতা তারেক রহমানও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। আমি আগে থেকেই এই নীতি অনুসরণ করে আসছি। দুর্গাপুর-কলমাকান্দায় দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না।”
উন্নয়নকাজে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নাকচ করে কায়সার কামাল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমার সহোদর ভাই, মামা, আত্মীয়-স্বজন বা দলীয় নেতাকর্মী- প্রত্যেকেরই সৎপথে ব্যবসা করার অধিকার আছে। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই। যে কাজ নেবে, তাকে শতভাগ কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে।”
ঠিকাদারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। যে মাপ ও মানের ইট বা রড দেওয়ার কথা, সেটাই দিতে হবে। বিগত ১৫ বছরে ঠিকাদারদের এমপি এবং নেতাদের পার্সেন্টেজ দিতে হতো। আমি পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, এমপি হিসেবে আমি কোনো টাকা নেব না এবং কোনো নেতাকেও নিতে দেব না। তাই ঠিকাদারদের কাজের মান নিয়ে কোনো গাফিলতি সহ্য করা হবে না।” ইতিমধ্যে দুর্গাপুরে কাজে অনিয়ম করায় এক ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান স্থানীয় এই সংসদ সদস্য। তিনি স্থানীয়দের উন্নয়ন কাজের তদারকি করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “রাস্তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং গভীরতা ঠিক আছে কি না, তা আপনারা দয়া করে খেয়াল রাখবেন। কাজ যে-ই করুক না কেন, অনিয়ম দেখলে প্রশাসনকে জানাবেন। আইন সবার জন্য সমান।”
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “দেশের স্বার্থে এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করুন। যারা নীতির সাথে সমন্বয় করতে পারবেন না, তারা অন্য জায়গায় চলে যেতে পারেন। এই এলাকায় কাজ সঠিকভাবে করতে হবে।”
রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান (বাবুল) এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম। এছাড়াও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সম্মানজনক পদে আসীন হওয়ার জন্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালে সর্বস্তরের মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আগামী দিনে সৎ ও নিষ্ঠাবান জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার আশা ব্যক্ত করে তার বক্তব্য শেষ করেন।
পড়ুন : পরিবেশ, ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সেমিনার


