প্রায় দুই মাস হতে চলল ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এরপর থেকেই টালমাটাল জ্বালানি তেলের বাজার। এই যুদ্ধের প্রভাব পড়ে জ্বালানি উৎপাদনেও। যুদ্ধ শুরুর এই ৫০ দিনে ৫০ বিলিয়ন বা পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল হারিয়েছে বিশ্ব। এর প্রভাব থাকবে আগামী কয়েক মাস থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত। ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের হিসাবে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয় ইরান। যুদ্ধের আগে এ পথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। মূলত, এই জলপথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ তেল বিশ্বের অন্যান্য অংশে পৌঁছায়।
গতকাল শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার কথা জানান। লেবাননের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পরই তিনি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এই ঘোষণা দেন। যদিও আজ ফের হরমুজ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত অবরোধের কারণে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের আশা, খুব শিগগিরই স্থায়ীভাবে ইরান যুদ্ধ থামবে। তবে, তিনি নির্দিষ্ট করে কোনও সময়সীমা দেননি।
শিপিং ডেটা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার’র তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজার থেকে ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট সরবরাহ হারিয়ে গেছে, যা আধুনিক ইতিহাসে জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন।
বৈশ্বিক জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির প্রধান বিশ্লেষক ইয়াত মোয়াত বলেন, “বিশ্বজুড়ে ১০ সপ্তাহ ধরে বিমান চলাচলের চাহিদা কমে যাওয়া; ১১ দিন ধরে বিশ্বব্যাপী কোনও ধরনের সড়ক পরিবহন না থাকা অথবা পাঁচ দিন ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য তেলের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি—এই পরিস্থিতিগুলোর সমতুল্য।”
রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এই ৫০০ মিলিয়ন ব্যারেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক মাসের তেলের চাহিদার সমান। এমনকি, পুরো ইউরোপের এক মাসেরও বেশি তেলের চাহিদার সমতুল্য।
এছাড়া, এই ৫০০ মিলিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য প্রায় ছয় বছরের জ্বালানি ব্যবহারের সমান—যেখানে ২০২১ অর্থবছরে বার্ষিক ব্যবহার ছিল প্রায় ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল। এছাড়া এই জ্বালানি দিয়ে বিশ্বের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন শিল্প চলবে প্রায় চার মাস। কারণ, বৈশ্বিক শিপিং খাতে প্রতিদিন প্রায় ৪২ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহৃত হয়।
ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো গত মার্চ মাসের প্রতিদিন ৮০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে পারেনি, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুটি তেল কোম্পানি এক্সন মবিল ও সেভরনের সম্মিলিত উৎপাদনের প্রায় সমান।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমান জেট ফুয়েল রফতানি করেছিল প্রায় ১৯ দশমিক ছয় মিলিয়ন বা এক কোটি ৯৬ লাখ ব্যারেল। কেপলারের তথ্যমতে, মার্চ এবং এপ্রিল (এখন পর্যন্ত) মিলিয়ে তা কমে মাত্র ৪১ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এই জেট ফুয়েল দিয়ে নিউ ইয়র্কের জেএফকি বিমানবন্দর এবং লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার রাউন্ড-ট্রিপ ফ্লাইট চালানো যেত।
পড়ুন : যুক্তরাষ্ট্রের ‘জলদস্যুতার’ অভিযোগে ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান


