বিজ্ঞাপন

ভারতে আসছে রুশ সেনারা, দক্ষিণ এশিয়ার সমীকরণ ওলটপালট

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সমীকরণ ওলটপালট করে দিল। দীর্ঘ আট বছরের আলোচনার পর কার্যকর হলো নয়াদিল্লি ও মস্কোর ঐতিহাসিক সামরিক চুক্তি ‘রেলোস’।

যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ায় সরাসরি পা রাখছে রুশ সেনারা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর যখন পশ্চিমারা রাশিয়াকে একঘরে করতে চেয়েছিল, তখন মস্কো দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক বলয় তৈরি করল। এই ঘটনা ওয়াশিংটনের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

‘রেলোস’ চুক্তির পুরো নাম ‘রিসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিকস সাপোর্ট’। সহজ ভাষায়, এটি একটি সামরিক সহযোগিতা বিনিময় চুক্তি।

এই চুক্তির ফলে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ, বিমান এবং সেনারা এখন থেকে ভারতের সামরিক ঘাঁটি ও বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। তারা সেখান থেকে জ্বালানি নিতে পারবে, খাবার সংগ্রহ করবে এবং প্রয়োজনে মেরামতও করতে পারবে। একইভাবে ভারতও রাশিয়ার বিশাল আর্টিক অঞ্চল ও দূরপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

চুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো—উভয় দেশ একে অপরের ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ ৩ হাজার সেনা, ৫টি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০টি সামরিক বিমান মোতায়েন করতে পারবে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে রাশিয়ার সাথে এমন চুক্তি আগে কখনো হয়নি।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এটি স্বাক্ষরিত হয় এবং চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি এটি কার্যকর হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছর, তবে প্রয়োজনে তা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

রেলোস চুক্তিটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ কোনো সামরিক চুক্তি নয়; এর পেছনে তিনটি বড় ‘খেলা’ কাজ করছে। প্রথমত, ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই মহাসাগর দিয়ে যায়। এখানে রাশিয়ার উপস্থিতি মানেই ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য।

এতদিন এই অঞ্চলে আমেরিকার যে একক প্রভাব বা পশ্চিমাদের দাপট ছিল, এখন সেখানে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ ও সেনাদের নিয়মিত আনাগোনা শুরু হবে।

দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। আমেরিকা ও ইউরোপ যখন রাশিয়ার ওপর শত শত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাকে একঘরে করতে চাচ্ছে, তখন এই চুক্তি প্রমাণ করল রাশিয়া মোটেও একা নয়। এটি কেবল একটি সামরিক চুক্তি নয়, বরং আমেরিকার ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের বিপরীতে রাশিয়ার এক শক্ত পাল্টা জবাব।

তৃতীয়ত, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে একটি প্রধান অস্ত্র বা ‘কাউন্টারওয়েট’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু ভারত রাশিয়ার সাথে এই চুক্তি করে বুঝিয়ে দিল, তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অংশ নয়। এই তিনটি কারণ রেলোস চুক্তিকে কেবল সামরিক নয়, বরং একটি বড় স্ট্র্যাটেজিক সিগন্যাল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

মস্কোর জন্য এই চুক্তিটি দক্ষিণ এশিয়ায় এখন তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জায়গা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিক্রির জন্য এশিয়া বড় বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত রাশিয়ার সস্তা অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতা। মস্কোর জন্য এই চুক্তি কেবল জ্বালানি বিক্রির পথ নয়, বরং সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ।

রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ আন্দ্রে করতুনভের মতে, এর মাধ্যমে রাশিয়া ভারত মহাসাগরে নিজেদের নৌবাহিনীর শক্তি স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি করার সুযোগ পেল।

অর্থাৎ, রাশিয়া প্রমাণ করল যে, পশ্চিমাদের শত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম।

ভারতের জন্য এই চুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্রার মতে, ভারত এখন রাশিয়ার আর্কটিক এবং দূর প্রাচ্যের রুশ ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাবে। এটি ভারতকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খুলে যাওয়া নতুন নতুন সামুদ্রিক রুটে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেবে।

এছাড়া ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য মাথাব্যথার কারণ। রাশিয়ার সাথে ভারতের এই চুক্তি চীনের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

এই লড়াই কেবল ভারত আর রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের ‘ডাবল গেম’ একদিকে তাকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়াকে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত করছে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে রুশ যুদ্ধজাহাজের নিয়মিত উপস্থিতি এবং বিপরীতে মার্কিন ও পশ্চিমা জোটের নজরদারি এই জলসীমায় স্নায়ুযুদ্ধের মতো উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যে দুটি পথ খোলা

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন