টানা তিন দিনের অসময় বৃষ্টিতে মাদারীপুরে কৃষি খাতে নেমেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। বিশেষ করে আগাম জাতের রোপা আমন ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের মধ্যক চর এলাকায় শুক্রবার (১ মে) সকালে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এখন ছোট ছোট জলাধারে পরিণত হয়েছে। চোখ যতদূর যায়, পানির নিচে ডুবে আছে পাকা ধান। কোথাও এক হাঁটুর ওপরে ভাসছে ধানগাছ, কোথাও আবার পুরো ক্ষেতই তলিয়ে গেছে।
মাদারীপুরে চলতি মৌসুমে ৩৩ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে ইরি বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ৩২ হাজার ৭৮০ হেক্টর বেশি জমিতে ধান চাষ হয়েছে। মাদারীপুরে এবার সাড়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কৃষকরা জানান, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করা না গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মধ্যকচক এলাকার কৃষক হান্নান হাওলাদার বলেন, মাত্র কয়েকদিন আগেও যে মাঠ ছিল সোনালি ফসলে ভরা, সেই মাঠ এখন আমাদের হতাশার প্রতিচ্ছবি। অনেক ক্ষেতেই ধান হলুদ হয়ে নষ্ট হতে শুরু করেছে। কৃষি মৌসুমের শেষ সময়ে এমন বৃষ্টি আমাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
পাট চাষি মামুন বলেন,তবে এর মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। অনাবৃষ্টির কারণে পাটের ফলন তুলনামূলক ভালো হওয়ায় আমাদের আংশিকভাবে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছি। কিন্তু ধানের ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি যে সেই স্বস্তি খুব একটা কাজে আসছে না।
ঈমানী মিয়া বলেন, “ছোটভাই চার লাখ টাকা খরচ করে ওমানে গিয়েও কিছু করতে পারেনি। ফিরে এসেছে। এরই মধ্যে বোরোতে প্রায় ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হলো। আয় নেই, ঋণ আছে, দুশ্চিন্তায় আছি।” একই এলাকার শাহাবুদ্দিনের ৩বিঘা, মুহিত মিয়ার ২ বিঘা, কবির মিয়ার ৫ বিঘা এবং ফজল মিয়ার ৪ বিঘা জমির ধানও পানির নিচে চলে গেছে। তাদের ভাষ্য, পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ায় কিছুই ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
একই এলাকার কৃষক পরিবারের কলেজছাত্র দেলোয়ার হোসেন রাজু বলেন, “দুদিন পানির নিচে থাকায় ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ কেউ কাটছেন, কিন্তু খরচ বেশি। লোকসানই বাড়বে।”
“অনেক কষ্ট করে ধান লাগাইছি। ভালো ফলনের আশা ছিল। কিন্তু এই বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেল। এখন পানি না নামলে ধান পচে যাবে।”
মাদারীপুর সদর উপজেলার পাচখোলা ইউনিয়নের বাহেরচর কাতলা গ্রামের কৃষক আনোয়ার বাদশা জানান, এ মৌসুমে সার, বীজ, কীটনাশক ও ডিজেলসহ সবকিছু ঠিকমত পাওয়া যায়নি।তাই দাম একটু বেশি হওয়ায় আবাদে খরচও বেশি হয়েছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার জমিতে ধান ভালো হয়েছেও গত বছরের চেয়ে এ বছর খরচ বেশি। কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের সাজেম মাতুব্বর জানান, সরকার যদি সার বীজ কীটনাশক বিনামূল্যে দিত তাহলে ভালো হতো।
মাদারীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক ডক্টর রহিমা খাতুন বলেন, এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। আর উচ্চফলনশীল ধান চাষ করায় ফলনও ভালো হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত দাবদাহে ধানের শীষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেই দাবদাহের আগেই ধান পেকে গেছে। কিন্তু কয়েকদিন বৃষ্টি কারনে কয়েক জায়গায় ধানের কিছুটা ক্ষতি হলেও পাটের আবাদ ভালো হয়েছে। এতে কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েনি ।
পড়ুন:জিয়াউর রহমানের ত্রিপক্ষীয় শ্রমনীতি শ্রম কল্যাণের ভিত্তি মজবুত করেছে: রাষ্ট্রপতি
দেখুন:‘ঋণ খেলাপি’ নিয়ে সংসদে যা বললেন অর্থমন্ত্রী
ইমি/


