নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় কৃষকদের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকটের অবসান ঘটাতে নয় কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি মৃত খাল খনন ও পুনঃখনন কাজের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) সকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) অধীনে প্রকল্প দুটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় গৃহীত উদ্যোগের ফলে এলাকার হাজারো কৃষকের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন ধর্মের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সারাদেশে সাত হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরে এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্গাপুরে দুটি প্রকল্পের আওতায় নয় কিলোমিটার খাল খনন করা হবে।
দুর্গাপুরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) জহিরুল ইসলাম জানান, প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ টাকার দুটি প্রকল্প ৪০ দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প দুটি হলো- রামবাড়ি পাগাইরা খাল (কাকৈরগড়া ইউনিয়ন) সোমেশ্বরী নদী হতে শুকনাকুড়ি ভায়া পূর্ব দিকে গলইখালি ব্রীজের নিকট কংস নদী পর্যন্ত পাঁচ হাজার মিটার (৫ কিলোমিটার) খনন। এর জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে এক কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা।
পচা খাল (কুল্লাগড়া ইউনিয়ন) মাদুপাড়া বার্নাট কুবির বাড়ির নিকট পাহাড়ী ছড়া হতে সিএমবি ব্রীজ হয়ে খুজিপড়া হয়ে নেথপাড়া পচা খালের ব্রীজ হয়ে চিনাকুড়ি বিল পর্যন্ত চার হাজার মিটার (৪ কিলোমিটার) খনন। এর জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে এক কোটি তিন লাখ তিন হাজার ৬৯০ টাকা।
দুর্গাপুর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা আফসানা বলেন, “খাল দুটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকদের ফসলি জমি চরম জলাবদ্ধতার শিকার হতো এবং জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাই আমরা দুটি খালকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। মাননীয় ডেপুটি স্পিকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই কাজ পরিচালিত হচ্ছে।”
প্রকল্প দুটির মানবিক দিক তুলে ধরে পিআইও জহিরুল ইসলাম জানান, মৃত খালের জায়গা দখল করে যেসব ভূমিহীন মানুষ ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করছিলেন, খাল খননের ফলে তারা যেন গৃহহীন না হন, সেদিকেও প্রশাসন নজর রাখছে। উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সহযোগিতায় খাস জমিতে বন্দোবস্ত দিয়ে তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ছিল এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। ডক্টর অঞ্জন চিছাম জানান, “এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এখানে মুসলিম, হিন্দু এবং খ্রিষ্টান- এই তিন ধর্মের মানুষ ও নেতৃবৃন্দ সম্মিলিতভাবে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেছেন। এটি প্রমাণ করে আমরা এখানে কতটা শান্তিতে ও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করছি “ তিনি আরও যোগ করেন, এই খাল খনন দুর্গাপুর-কলমাকান্দা অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বহু বছর ধরে খাল দুটি বন্ধ থাকায় বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকটে ভুগেছেন স্থানীয় কৃষকরা। কাজ শুরু হওয়ায় তাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
স্থানীয় এক কৃষক স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, “বর্ষাকালে আমাদের ধানের জমি পানিতে তলিয়ে যেত, পানি নামতে পারত না। আবার শুকনো মৌসুমে সেচের পানির অভাবে ফসল ফলানো যেত না। ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মহোদয়ের উদ্যোগে আমরা সকল কৃষক ভীষণ উপকৃত হলাম।”
স্থানীয় এক নারী বাসিন্দা জানান, “খাল বন্ধ থাকায় ফসলের অনেক ক্ষতি হতো। এখন খাল খনন হলে ফসল ভালো হবে, পাশাপাশি খালে মাছ চাষ করেও অনেকে স্বাবলম্বী হতে পারবে।”
প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত এমন উদ্যোগ সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হলে দুর্গাপুরের কৃষি অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পড়ুন : জমি দখলের অভিযোগে মানববন্ধন


