সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার পর ভ্রমণবিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে পাঁচ বছর আগে সহকর্মীদের নিয়ে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন সিনহা মো. রাশেদ খান। করোনা ভাইরাস মহামারির সময় ২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজার–টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর চেকপোস্টে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে।
এই হত্যাকাণ্ডে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন কক্সবাজারের আদালত। চলতি বছর ২ জুন বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন।
মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন (ডেথ রেফারেন্স) মঞ্জুর ও দণ্ডিতদের আপিল খারিজ করা হয়। পাশাপাশি খালাসপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে বাদীর ফৌজদারি আবেদনও খারিজ করা হয়।
আজ রোববার (২৩ নভেম্বর) রায় ঘোষণার প্রায় পাঁচ মাস পর ৩৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ‘রাষ্ট্র বনাম মো. লিয়াকত আলী এবং অন্যান্য’ শিরোনামে রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
রায়ে সিনহা হত্যার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত কারণে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে সিনহা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভ্রমণবিষয়ক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং ‘জাস্ট গো’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলেন। এই চ্যানেলের কাজেই ২০২০ সালের ২ জুলাই সহকর্মী সিফাত, শিপ্রা দেবনাথ ও রুপ্তিকে নিয়ে কক্সবাজার যান।
কক্সবাজার, টেকনাফ ও রামুর বিভিন্ন স্থানে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকত সম্পর্কে স্থানীয়দের অভিযোগ পান সিনহা। জুলাইয়ের মাঝামাঝি একদিন মেরিন ড্রাইভে তাদের সঙ্গে দেখা হলে সিনহা সেই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রদীপ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং এলাকা ছেড়ে যেতে বলেন।
৩১ জুলাই রাতে ভিডিও ধারণ শেষে রিসোর্টে ফেরার পথে রাত সাড়ে ৯টার দিকে শামলাপুর তল্লাশি-চৌকিতে সিনহার গাড়ি থামানো হয়। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত উঁচু করে নিজের পরিচয় দিলে পরিদর্শক লিয়াকত আলী ‘শ্যুট শ্যুট’ বলে দুই রাউন্ড গুলি করেন।
সিনহা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লে লিয়াকত আবারও দুই রাউন্ড গুলি চালান। পরে তাকে হাতকড়া পরানো হয়। পানি চাইলে লিয়াকত গালি দিয়ে তার কোমরে লাথি মারেন।
কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে আসেন ওসি প্রদীপ। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা গুরুতর আহত সিনহাকে প্রদীপ বলেন, ‘অনেক টার্গেট করে তোকে মেরেছি’। এরপর তিনি বুটজুতা দিয়ে সিনহার গলায় বামদিকে চাপ দেন। রায়ে বলা হয়েছে, প্রদীপের চাপ দেওয়ার পর সিনহার শরীর কেঁপে ওঠে এবং ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়—এভাবেই ওসি প্রদীপ তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
ঘটনার পর সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস ২০২০ সালের ৫ আগস্ট লিয়াকতকে প্রধান আসামি করে নয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওসি প্রদীপ ছিলেন মামলার দুই নম্বর আসামি।
র্যাব তদন্ত করে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রদীপসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি রায়ে প্রদীপ ও লিয়াকতকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই রায়ই হাইকোর্ট বহাল রাখে।
পড়ুন : সেনা কর্মকর্তাদের সশরীরে নয়, ভার্চুয়ালি হাজিরা দেওয়ার আবেদন


