গাজীপুরের শিমুলতলী এলাকায় বাণিজ্য মেলার আড়ালে বসেছে জুয়ার আসর, চলছে লটারি প্রতারণা। প্রবেশমূল্যের নামে প্রতিটি দর্শনার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। সেই টিকিট দিয়ে ‘লটারি কুপন’ বলে দাবি করে বড় পুরস্কারের লোভ দেখানো হলেও শেষ পর্যন্ত কেউই পুরস্কার পাচ্ছেন না। ফলে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হচ্ছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, বাণিজ্য ও কুটির শিল্প মেলা নাম দেয়া হলেও এটির মূল্য উদ্দেশ্য লটারিচ বানিজ্য ও জুয়া (হাউজি) খেলা। প্রতিদিন শত শত অটোরিকশা দিয়ে মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় লাখ লাখ লটারি বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্ত চিত্র ভিন্ন। লটারি যারা পাচ্ছে তারা মেলার কর্তৃপক্ষের সাজানো লোকজন। দিনমজুর, রিকশাচালকসহ নিম্ন আয়ের মানুষ স্বল্প টাকার বিনিময়ে ভাগ্য ফেরানোর আশায় কুপন কিনলেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুরে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলা বসানো হলেও জুয়ার আসর নামে পরিচিতি পেয়েছে। র্যাফেল ড্র-এর নামে মোটরসাইকেল, স্বর্ণ, ল্যাপটপ, টিভি, ফ্রিজ, ডিনারসেটসহ নানা রকম পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে বিক্রি হচ্ছে বিপুলসংখ্যক টিকিট। আর এসব টিকিট বিক্রির জন্য টার্গেট করা হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষদের। রিকশাচালক ও দিনমজুর শ্রেণির লোকজন অনেকে র্যাফেল ড্র ও জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এসব খেটে খাওয়া লোকজন।
নাগরিকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিদিন গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় দুই শতাধিক টিকিট বিক্রয় কর্মী অটোরিকশা, সিএনজি ও ট্রাক নিয়ে বেরিয়ে যায়। সব্ধ্যায় তাদের জমা দেন তাদের বাক্স যেখানে প্রতিদিন বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টিকিট যার। মুল্য ৯ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা। রাত ১০টার পর হয় ড্র। সেখানে কৌশলে পুরস্কার তুলে দেয়া হয় নিজস্ব লোকদের হাতে যা পরবর্তীতে তাদের কাছেই থেকে যায় বলে শুনা যায়।
এর আগে এই মেলায় নাগরদোলা হেলে পড়ে ৫ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিলো। যা এলাকাজুড়ে বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির পক্ষে একটি অবহিতকরণ চিঠি বিতরণ করা হয়। চিঠির বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে বিএনপিএফ লিমিটেড আর্মি ফার্ম্মা ফ্যাক্টরি নির্ধারিত ফাকা স্থানে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলার আয়োজন প্রসঙ্গে। বেনারশী ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের স্বত্বাধিকারী বাদল মিয়া “ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প” মেলার আয়োজন করে।
এই মেলার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ডুয়েট সচেতন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে গত ২১ সেপ্টেম্বর গাজীপুর জেলা প্রশাসক বরাবরের একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে আর্মি ফার্মা মাঠে অনুষ্ঠিত মেলায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি প্রসঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়। আবেদনে কয়েকটি সমস্যার কথা তুলে ধরে চার দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়।
স্থানীয়রা জানায়, মহানগরীর শিমুলতলী এলাকায় সেনানিবাসের কাছে বিএমটিএফ লিমিটেড আর্মি ফার্মা ফ্যাক্টরির জন্য নির্ধারিত স্থানে আয়োজিত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলার আয়োজন করা হয়। মেলাটি মূলত নাম কায়েস্তে হলেও এর আড়ালে রয়েছে লটারি বাণিজ্য ও জুয়ার আসর।
গাজীপুর প্রশাসনের কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, মেলা পরিপত্র অনুযায়ী জেলা ও মহানগর এলাকায় এক মাসের জন্য মেলার অনুমতি দিতে পারেন জেলা প্রশাসক। কিন্তু এ মেলা আয়োজনের জন্য অনুমতির চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর কোনো আবেদই করেনি কর্তৃপক্ষ। তারা একটি অবহিতকরণ চিঠি দিয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর অননুমোদিত মেলা বন্ধ করার জন্য আমরা মহানগর পুলিশকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছি। ওই মেলার বিষয়ে পার্শ্ববর্তী ডুয়েটের শিক্ষার্থীরাও আপত্তি জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছে।
গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, জেলা প্রশাসকের নিকট কেউ কোন আবেদন করেনি, তাই মেলা আয়োজনের অনুমতি দেয়ার প্রশ্ন অবান্তর।
এ বিষয়ে মেলা আয়োজকদের একজন বলেন, আমরা সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছি। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করে ক্যান্টর্নমেন্ট বোর্ড।
এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুর হাসান বলেন, ‘ জেলা প্রশাসন থেকে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো মেলার বিষয়ে। আমরা স্পষ্ট জানিয়েছি মেলার অনুমতির জন্য আমাদের কাছে আবেদন করেনি। তাই আমরা কোনো অনুমতি দেইনি।’
সেনাবাহিনীর নামে পরিচালিত এই মেলার আড়ালে দিনের পর দিন নানা অপকর্ম চললেও প্রশাসনের নিরব ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
পড়ুন : গাজীপুরে অনুমোদনহীন মেলায় চলন্ত নাগরদোলা হেলে পড়ে ৫ জন আহত


