২৫/০২/২০২৬, ১:১৮ পূর্বাহ্ণ
23.2 C
Dhaka
২৫/০২/২০২৬, ১:১৮ পূর্বাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

বেগম খালেদা জিয়া—একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা এক অনন্য রাজনৈতিক অভিযাত্রার নাম। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশ পরিচালনা করেছেন। তার এই উত্থান ছিল নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের এক দীর্ঘ ইতিহাস।

বিজ্ঞাপন

বিএনপির প্রেস উইং ও দলীয় ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুঁড়ির নয়াবস্তির একটি ছোট শহরে তার জন্ম। জন্মনাম রাখা হয় ‘শান্তি’; পরবর্তীতে মেজো বোন সেলিনা ইসলাম তাকে ‘পুতুল’ নামে ডাকতেন। পরে পরিবার দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ১৯৬০ সালে তিনি দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। কলেজে অধ্যয়নকালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিবাহ হয়।

১৯৬৫ সালে ডিগ্রি কোর্সে অধ্যয়নরত অবস্থায় স্বামীর কর্মস্থল পশ্চিম পাকিস্তানে যান বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশের মানুষের ওপর নৃশংস হামলা শুরু করলে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই অস্থির পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়া কিছুদিন চট্টগ্রামে আত্মগোপনে থাকার পর দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় আসেন। বড় বোন খুরশীদ জাহান হকের বাসায় ২৭ জুন পর্যন্ত তিনি সন্তানদের নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন।

২ জুলাই পাকিস্তানি সেনারা তাকে দুই সন্তানসহ আটক করে। দীর্ঘদিন গৃহবন্দী থাকার পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে তিনি মুক্তি পান।

১৯৮১ সালের ৩১ মে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদৎবরণ করেন। ততদিন পর্যন্ত একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে জীবনযাপন করা খালেদা জিয়া দলের নেতাকর্মীদের আহ্বানে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। পরের বছর মার্চে হন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালনকালে বেগম খালেদা জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, নেদারল্যান্ডসের রানী জুলিয়ানা প্রমুখ বিশ্বনেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সাতদলীয় জোট গঠনে নেতৃত্ব দেন এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রহসনের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে স্বৈরাচারের সঙ্গে আপস না করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাকে সাতবার গ্রেপ্তার করা হয়। এই সময়েই জনগণ তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সংকট বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তাকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যা পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৯৬ সালে বিএনপির নির্বাচনী সাফল্যের পর তিনি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার রক্ষা করতে এক মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করেন। একই বছরের জুনের নির্বাচনে বিএনপি সংসদের বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন লাভ করে।

১৯৯৯ সালে তার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের অঙ্গীকার নিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে অবদানের জন্য ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থানে স্থান দেয়।

২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাকে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ সম্মাননায় ভূষিত করে—যা কোনো বিদেশি নেত্রীর জন্য প্রথম। ২০১৮ সালে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা প্রদান করে।

২০০৭ সালের সেনানিয়ন্ত্রিত সরকারের সময়ে তাকে ও তার পরিবারকে লক্ষ্য করে কঠোর নিপীড়ন চালানো হয়। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। দীর্ঘ কারাভোগের পর ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি।

অবশেষে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দেশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হলে রাষ্ট্রপতির আদেশে ৬ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি লাভ করেন।

গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক—বেগম খালেদা জিয়ার এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ও অনুপ্রেরণাময় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

পড়ুন: এক নজরে প্রতিরোধের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন