সৃষ্টি না ধ্বংস, সৌন্দর্য না বর্বরতা, আনন্দ না ভয়- সব প্রশ্নের শেষ গন্তব্য একটাই: আমরা জ্ঞানের দিকে এগোচ্ছি, নাকি অজ্ঞতার দিকে? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই যশোরের সুলতানপুর মাঠে সরিষা ক্ষেতে পাশে বৈঠকি ঢঙে বসে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমধর্মী পাঠচক্র ও চিন্তনমূলক আয়োজন ‘জ্ঞানযাত্রা ও প্রতিবেশ অধ্যয়ন ২০২৬’।
‘সপ্তাহে একটি বই পড়ি’র আয়োজনে শনিবার (১০ জানুয়ারি ২০২৬) সরিষাক্ষেত ঘেরা খোলা প্রান্তরে দিনব্যাপী এই আয়োজনের মূল পাঠ্য ছিল নোবেল বিজয়ী লেখক পাওলো কোয়েলহোর বিশ্বখ্যাত উপন্যাস দ্য আলকেমিস্ট। গ্রাম ও শহরের মানুষের সম্মিলনে, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে পাঠ, আলোচনা ও সংলাপ মিলিয়ে দিনটি পরিণত হয় এক অনন্য বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায়।
দিগন্তজোড়া হলুদ সরিষা ফুলের মাঝে গোলাকার আসনে বসে শুরু হয় পাঠচক্র। শীতের নরম বাতাস ও কোমল রোদের আবেশে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছায় আলোচনা, গান ও কবিতার ধারা। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহ্জাহান কবীর গ্রন্থটি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। পাঠচক্র সদস্য সায়মা আক্তার তৌফার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন অভিজিৎ কুমার তরফদার।
আলোচনায় অংশ নেন দৈনিক প্রথম আলোর যশোর জেলা প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম, নুরুন্নবী হৃদয়, মিঠুন হোসেন, লিমা, স্বপ্না, জান্নাতুল ফৈরদৌস ইলা, খালিদ হাসান মৃধা প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন লিমা এবং কবিতা আবৃত্তি করেন স্বপ্না। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মাছরাঙা টিভির যশোর জেলা প্রতিনিধি রাহুল রায় এবং দৈনিক রানারের স্টাফ রিপোর্টার এস এ সিয়াম।
আয়োজকরা বলেন, জ্ঞানের চর্চা দুর্বল হলে সমাজে অজ্ঞতা, অন্ধত্ব ও বর্বরতা বাড়ে, যা সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে। শিক্ষা ও জ্ঞান মানুষকে এই অন্ধকার থেকে মুক্ত করে; গড়ে তোলে মানবিক, সৌন্দর্যবোধসম্পন্ন ও কল্যাণমুখী মনন। তাঁদের মতে, উদার, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণে জ্ঞানের প্রবাহ অপরিহার্য; সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে প্রয়োজন উন্নত মানুষ, আর তার জন্য দরকার রুচি ও শীলিত জীবনবোধের বিকাশ।
পাঠচক্রে দ্য আলকেমিস্ট-এর দর্শন বিশেষভাবে আলোচিত হয়। বক্তারা বলেন, মানুষ যখন কল্যাণমুখী স্বপ্নকে আন্তরিকভাবে অনুসরণ করে, তখন প্রকৃতি ও বিশ্ব সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযাত্রী হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত স্বপ্নের ভেতর দিয়েই যে সার্বজনিক কল্যাণের পথ উন্মুক্ত হয়, এই উপলব্ধিই গ্রন্থটির মূল অনুপ্রেরণা।
এই আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা ছিল প্রতিবেশ অধ্যয়ন—প্রকৃতিকে পাঠ করা ও অনুভব করা। হলুদ ফুলে মোড়ানো প্রান্তর, গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ, ধ্যানযোগ, প্রকৃতির কোলে আহার এবং সন্ধ্যায় অগ্নি-প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে খেজুর রস উপভোগ, সব মিলিয়ে জ্ঞানচর্চা রূপ নেয় এক সমন্বিত জীবনানুভূতিতে।
দিনব্যাপী কর্মসূচিতে ছিল আগমন ও অভ্যর্থনা, চা-চক্র, জ্ঞানযাত্রা, সরিষাক্ষেত পরিভ্রমণ, পাঠচক্র ও পাঠ-প্রতিক্রিয়া, মধ্যাহ্নভোজ, উন্মুক্ত আলোচনা, পিঠা পর্ব এবং স্থানীয় শিশু-কিশোরদের মাঝে বই বিতরণ।
আয়োজকদের ভাষ্য, এই উদ্যোগের লক্ষ্য মানুষকে জ্ঞানের পথে, সৌন্দর্য ও কল্যাণের পথে আহ্বান জানানো। আরও বেশি মানুষ এই যাত্রায় যুক্ত হলে সমাজ হবে আরও শান্তিময়, মানবিক ও আলোকিত। শেষপর্বে ‘সপ্তাহে একটি বই পড়ি’ উদ্যোগের পক্ষ থেকে সকল পাঠচক্রবন্ধু ও আলোক-সহযাত্রীকে নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানযাত্রায় যুক্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
পড়ুন : ৫০ বছর পূর্তি: ঢাকায় চাইনিজ লিটারেচার রিডার্স ক্লাবের যাত্রা শুরু


