জনজীবনে বিগত দিনের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার অতিক্রান্তের পর, আগত নির্বাচন জনমনে এক প্রশান্তি আর প্রাণচাঞ্চল্যের সূচনা করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দেশপ্রেমের যথার্থ দীর্ঘ সঞ্চিত আবেগ বাংলার মানুষকে করেছে উদ্বেলিত। দলমত নির্বিশেষে তাদের প্রচারে বেক্ত করেছেন দেশের মঙ্গলে উন্নয়নের রূপরেখা। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালের মে মাসে প্রয়াত এক দেশপ্রেমিকের যোগ্য উত্তরসূরী আগত দিনগুলোর স্বপ্ন স্বরূপ বিবিধ রূপরেখা নিরূপণ করছেন। তারই সূত্র ধরে প্রস্তাবিত “ফ্যামিলি কার্ড“ জনমানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে এক বাস্তবমুখী ভূমিকা রাখবে বলে দেশের মানুষ আশাবাদী। ২০০০ হইতে ২৫০০ টাকা সম্বলিত ফ্যামিলি কার্ড প্রায় ৪ কোটির অধিক পরিবারের জন্য বরাদ্দ থাকবে যার মাধমে জীবনমান উন্নয়ন প্রসারিত হবে।
এই আধুনিক প্রস্তাব এক দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষাতে অদিষ্টিত ছিলো যা আজ বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে। প্রস্তাবিত এই পন্থার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন, নারী উদ্যক্তার প্রসার, সামাজিক উন্নয়ন ও সন্তানদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাসহ বিবিধ ক্ষেত্রে এক অনন্য ভূমিকা রাখবে। পুরুষদের পাশাপাশি সমাজে সকল পর্যায়ে নারীর শক্ষমতা বৃদ্ধি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বৈষম্য দূরীকরণ ও দেশের অর্থনীতিতে এক বিরল ও সূদুরপ্রসারী সমাধান হিসেবে কাজ করবে।
আপাতদৃশ্যে মনে হতে পারে এই প্রস্তাব শুধু মাত্র এক পরিবারের মাসিক খরচ বহন করবে বই কিছুই নয়, প্রকৃত অর্থে আর প্রসার, সুযোগ হবে সূদুরপ্রসারী, অর্থনীতি বান্ধব আর বিস্তৃত পরিধি, যা পরিবারের সামগ্রিক চাহিদা মেটাবে, নারী উদ্যোক্তার ও কৃষির প্রসার ঘটাবে যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের ( ফ্যামিলি কার্ড) সার্থক বাস্তবায়নের জন্য আগামী দিনের নির্বাচিত সরকার প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন বলে বিশ্বাস রাখি। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্পূরক ভূমিকা পালন করবেন বলে আশা রাখি।
এই প্রকল্পের সার্থকতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক বরাদ্দ ও তার বাস্তবায়নের উপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান গুলোর সমন্নয় এক বিশেষ উদ্যোগ এই প্রকল্পের দীর্ঘ মেয়াদি সমাধান দেবে যা সরকারের অর্থনৈতিক বরাদ্দ ও বাৎসরিক বাজেটের উপর চাপ কমাতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ টাকা ২০০০-২৫০০ পাঁচ হইতে সাত বছর ৪ কোটি পরিবারের প্রতি ফ্যামিলি কার্ডের বরাদ্দ। এক অর্থে সরকারে দেয়া প্রতিশ্রুতি যা বিবিধ উপায়ে দেয়া যেতে পারে। সরাসরি অর্থ উত্তোলন অথবা খাত বরাদ্দ। খাত বরাদ্দের ক্ষেত্রে, খাদ্য বাবদ বরাদ্দ- যা সরকারি ভর্তুকি বা ন্যায্যমুল্লে সর্বররাহ, শিক্ষা বরাদ্দ- যা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত ও সরকারি হাসপাতাল হতে চিকিৎসা সেবা ও ঔষুধ প্রদান করা যাবে। এই গুলোর সমন্বয় এক প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করবে এবং এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে সরকার কর্তৃক জনজীবন নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে তা সফল হবে।
আমি বিশ্বাস করি, এর বাহিরেও এই প্রকল্প আরও গতিশীল হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যা সরকারের এই প্রকল্পের বেপ্তি আরও বিস্তৃত করবে।
সরকারে এই বিরল উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে, বরাদ্দকৃত টাকা ২০০০-২৫০০ কে এক সরকারি প্রতিশ্রুতি গণ্য করে ৫ বছরের গড় হিসেবেই বাৎসরিক কৃষি অথবা নারী উদ্যোক্তা ঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সকল ব্যাংকের জন্য প্রদান বাধ্যতামূলক করবেন। সহজ শর্তে, বিনা অথবা নিম্ন সুদে এই ঋণ ফ্যামিলি কার্ডের সাতে সংযুক্ত হবে যা সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম মেশিন, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংক হতে উত্তোলন করা যাবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাপের সংযোজন করা হবে যা দেশের সকল জেলা সদর ও উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এই ডিজিটাল পদ্ধতিতে সহজেই সকল পরিবারকে ব্যাঙ্কিং এর আওতায় এনে ভবিষৎ প্রজন্মকেও বাংলাদেশের ধারাবাহিক অগ্রগতিতে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব।
এই প্রস্তাব দেশের উন্নয়নে এক মাইল ফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
অতীত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্যাঙ্কিং খাতের অনীহা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল নীতি ও মনিটরিং এর অভাব, জেলা উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি ও ডিলেঢালা মনোভাব কৃষক ও নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। এই পরিস্থিতিতে তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের কঠোর নির্দেশনা ও পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো উপায় সম্ভব নয়। ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় সকল পরিকল্পিত কার্যকলাপ বাস্তবায়নের জন্য, জনজীবনের স্বার্থে সঠিক পদক্ষেপ অপরিহার্য। এই স্বার্থকতা, দেশের জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। সুচিন্তিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আন্তরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করছি।
দেশ আমাদের, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ ও পরিকল্পনা সকল ক্ষেত্রে অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। এর বাস্তবায়ন সরকারের একক প্রচেষ্টাতে সম্ভব নয় বলে সকল সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে তাই শান্তি ও সমৃদ্ধি আজ সময়ের দাবি। প্রয়াত রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকন তার বিখ্যাত গেটিস ব্রাগ বক্তৃতাতে বলেছেন “ মানুষের তরে, মানুষের জন্য/ কল্যাণে ও মানুষের মাধ্যমে, For the People, By The People, Of the People” জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণ হোক, বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠুক।
সবার আগে বাংলাদেশ।
লেখক : তারিক আফজাল, অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার
পড়ুন : জনমানুষের মৌলিক চাহিদাপূরণই স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি


