বিজ্ঞাপন

৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও অমীমাংসিতই জহির রায়হানের নিখোঁজ সংবাদ

রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার এক মাস পর বিজয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই হঠাৎ হারিয়ে যান এক আলোকবর্তিকা- চলচ্চিত্রকার, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক জহির রায়হান। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, আজকের এ দিনে বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরে নিখোঁজ হন তিনি। ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তার অন্তর্ধান আজও দেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত রহস্য।

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রাণপুরুষ জহির রায়হানের পুরো নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও সাংবাদিকতা তিন ক্ষেত্রেই রেখেছিলেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

মাত্র ৩৬ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে পৌঁছে দেন এক অনন্য উচ্চতায়। ১৯৫৭ সালে সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। পরে ১৯৬১ সালে ‘কখনও আসেনি’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার হাত ধরেই নির্মিত হয় পাকিস্তানের প্রথম রঙিন সিনেমা ‘সংগম’ এবং প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’।

তার সৃষ্টির শীর্ষে আছে ১৯৭০ সালের চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’, যা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক শক্তিশালী ‘চলচ্চিত্র দলিল’ হিসেবে আজও সমাদৃত। মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলোর বার্তা আর পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার চিত্র তিনি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছিলেন তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ নির্মাণের মাধ্যমে।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সাহিত্যেও তিনি ছিলেন সমান শক্তিমান। কালজয়ী উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছে আজও। এ উপন্যাসের জন্য তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, মরণোত্তর একুশে পদক এবং মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন গুণী এ নির্মাতা।

জহির রায়হানের বিদায়ী বার্তা আসে ১৯৭২র ৩০ জানুয়ারি রোববার সকালে। রফিক নামে এক অজ্ঞাত টেলিফোন কল আসে জহির রায়হানের বাসায়। টেলিফোনে তাকে জানানো হয়েছিল, তার বড় ভাই অর্থাৎ শহীদুল্লাহ কায়সার বন্দী আছেন মিরপুর বারো নম্বরে। ভাইকেকে বাঁচাতে হলে যেতে হবে তাকে মিরপুরে।

মিরপুরে রওনা দিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব ও আরও কয়েকজন। মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনী তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পুলিশের সদস্যরা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জহির রায়হানের টয়োটা গাড়িসহ থাকতে বলে অন্যদের ফেরত পাঠিয়ে দেন।

জহির রায়হানের ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাওয়া যায়নি। ১৯৭২ এর ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় কেটে গেছে। তবু জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত সত্য আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্ঘাটিত হয়নি। পরিবার, সহকর্মী ও অসংখ্য ভক্ত এখনও অপেক্ষা একদিন হয়তো জানা যাবে, কীভাবে হারিয়ে গেলেন বাংলা সংস্কৃতির এই ধ্রুবতারা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ‘পান্তা খেতাম লবণ ছাড়া, তখন খাবারের অভাব ছিল’

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন