২৮/০২/২০২৬, ১৭:৩৫ অপরাহ্ণ
31.8 C
Dhaka
২৮/০২/২০২৬, ১৭:৩৫ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

অবকাঠামোতে হাজার কোটি ব্যয়, তবু পানিশূন্য তিস্তা

নীলফামারীর ডালিয়ায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ—উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে তা আজ পানিশূন্য অবকাঠামোর প্রতীকে পরিণত হয়েছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ও সম্প্রসারিত ক্যানেল, স্লুইসগেট ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো থাকলেও মূল উৎস তিস্তা নদী-তে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর বুকজুড়ে এখন ধু ধু বালুচর। বর্ষা মৌসুমে যেখানে তিস্তার পানিপ্রবাহ গড়ে দুই লাখ কিউসেক ছাড়িয়ে যায়, শুষ্ক মৌসুমে তা নেমে আসে মাত্র দুই হাজার কিউসেকে। কোনো কোনো সময় ডালিয়া পয়েন্টে এই প্রবাহ ৫০০ কিউসেকেরও নিচে নেমে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের কারণেই বাংলাদেশ অংশে তিস্তা নদী মারাত্মক পানি সংকটে পড়েছে।

তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা ক্যানেল নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের ১২টি উপজেলায় বিস্তৃত। বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এসব ক্যানেলের সম্প্রসারণ ও সংস্কারকাজ চলমান, যার ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে বাস্তবে এসব ক্যানেলে এখনো তিস্তার পানি পৌঁছায়নি। অনেক স্থানে ক্যানেল গরু চরানোর মাঠ বা বালুচরে পরিণত হয়েছে।

নীলফামারী সদরের কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, “ক্যানেল আছে, কিন্তু পানি নেই। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিনে দ্বিগুণ খরচে জমিতে পানি দিতে হচ্ছে।”

মাঠপর্যায়ের তথ্যে জানা গেছে, প্রকল্পভুক্ত এলাকার ৬০–৭০ শতাংশ কৃষক বর্তমানে বিকল্প সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নদীর পানি না পাওয়ায় শ্যালো মেশিন ও ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে গিয়ে বিঘাপ্রতি সেচ খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়—যেখানে নদীর পানি পেলে এই খরচ হতো মাত্র ২০০–৩০০ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার ও জ্বালানির উচ্চমূল্য, যা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

নগর দারোয়ানী এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, “সার আর তেলের দাম বেশি, তার ওপর পানির জন্যও বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে কৃষক বাঁচবে কীভাবে?”

পানিপ্রবাহ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও রয়েছে স্পষ্ট অসংগতি। একদিকে দাবি করা হচ্ছে, সেচ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রয়োজনীয় পানি রয়েছে; অন্যদিকে একই প্রকল্পের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, উজানে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২,৫০০ কিউসেকের বেশি পানি পাওয়া যাচ্ছে না—যার বড় অংশই ব্যারাজের ভাটিতে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই পরস্পরবিরোধী তথ্য কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনাস্থা সৃষ্টি করছে।

১৯৯০ সালে যাত্রা শুরুর সময় তিস্তা সেচ প্রকল্পের সেচ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমি। তিন দশক পেরিয়েও সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি। চলতি ২০২৫–২৬ মৌসুমে সেচ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৭ হাজার হেক্টর। তবে বর্তমান পানিপ্রবাহের বাস্তবতায় এই লক্ষ্যের অর্ধেক অর্জনও অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞ ও নদী আন্দোলনকারীরা বলছেন, কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা ক্যানেল সম্প্রসারণ দিয়ে তিস্তা সেচ প্রকল্প কার্যকর করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমের পানি ধরে রাখতে রিজার্ভার বা জলাধার নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায়, হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর উত্তরের কৃষক বঞ্চিতই থাকবেন তাদের প্রাপ্য সেচ সুবিধা থেকে।

পড়ুন:সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতি করলে চাকরি তো যাবেই, মামলাও হবে: আইনমন্ত্রী

দেখুন:শিবচরে লুট হওয়া এলপিজি সিলিন্ডারের চালান আশুলিয়া থেকে উদ্ধার 

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন