ইরানে আক্রমণ করে অনেকগুলো বিপদের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন বিপদে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কেউ ফেলতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানে চলমান সংঘাত ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই যুদ্ধের বিপুল আর্থিক ব্যয় নিয়ে এখন খোদ ওয়াশিংটনের ভেতরেই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের ব্যয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি পেন্টাগন। তবে কংগ্রেসের বিভিন্ন সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, যুদ্ধের খরচ ইতোমধ্যেই আকাশচুম্বী পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের রাজনীতিকদের মধ্যেই উদ্বেগ বাড়ছে যে মার্কিন করদাতাদের অর্থ নজিরবিহীনভাবে সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এমএস নাউ এবং পলিটিকোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ২০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে।
এ বিষয়ে কংগ্রেসের হাউজ মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফ্রিজ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর কড়া সমালোচনা করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ ব্যয়ের এই বৃদ্ধি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণে হাউজ বাজেট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ব্রেন্ডন বয়েল ইতোমধ্যে কনগ্রেশনাল বাজেট অফিসকে বিস্তারিত বিশ্লেষণের অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, এই যুদ্ধ জ্বালানির দামসহ মার্কিন অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কতটা প্রভাব ফেলছে এবং একই সময়ে চীন বা অন্য কোনো ফ্রন্টে উত্তেজনা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখবে কি না।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফোর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এর বড় অংশই গেছে সামরিক গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে। গবেষকদের মতে, এই ব্যয়ের অল্প অংশ আগে থেকেই বাজেটে বরাদ্দ ছিল, আর বাকি অর্থের জন্য পেন্টাগনকে নতুন করে তহবিলের আবেদন করতে হবে।
অপারেশনাল দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অত্যন্ত বড় আকার ধারণ করেছে। ওপেন সোর্স তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ১২০টির বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ লাইটনিং ২ এবং এফ-২২ র্যাপটর যুদ্ধবিমান। পাশাপাশি দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ও অসংখ্য কার্গো বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এসব বাহিনী পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও জনবল ব্যয় হচ্ছে, যা সরাসরি মার্কিন বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার। ফলে এই ধরনের দামী অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারই প্রতিদিনের ব্যয়কে কয়েকশ কোটি ডলারে পৌঁছে দিচ্ছে।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, আগামী দিনে ইরানে বোমা হামলার তীব্রতা এবং যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। পেন্টাগন ইতোমধ্যে হারানো অস্ত্র ও সরঞ্জাম পুনরায় কেনার জন্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্পূরক বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে, যা কংগ্রেসে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
তবে মুদ্রাস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন আইনপ্রণেতারা এত বড় অঙ্কের অর্থ অনুমোদন করবেন কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

