বিজ্ঞাপন

সমস্যার সমাধানের বাতিঘর: মানবিকতায় অনন্য চট্টগ্রামের ডিসি জাহিদুল ইসলাম

বুধবার সকাল। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানুষের দীর্ঘ সারি। কারও হাতে ভাঁজ করা আবেদনপত্র, কারও চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ, আবার কারও কণ্ঠে শেষ আশ্রয়ের আকুতি। প্রতি সপ্তাহের মতো বুধবার (১১ মার্চ) সেখানে বসেছিল জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক গণশুনানি। আর সেই শুনানিতে একে একে মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহায়তা প্রত্যাশী মানুষের ভিড়ও বাড়তে থাকে। চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক সংকট—নানা সমস্যার কথা নিয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে হাজির হন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকের চোখে ছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতার ছাপ। তবে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে অনেকেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

গণশুনানির দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ২৭ বছর বয়সী রোকসানা হক রুপা। গুরুতর কিডনি রোগে আক্রান্ত এই তরুণীর জীবন এখন চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জীবন বাঁচাতে দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। কিন্তু ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই তার পরিবারের। জেলা প্রশাসকের সামনে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরলে তাকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয় এবং চিকিৎসার বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হয়।

আবেগঘন কণ্ঠে রোকসানা বলেন, “ডিসি স্যার সত্যিই অনেক মানবিক মানুষ। আমার সব কথা মন দিয়ে শুনেছেন। আমি যতক্ষণ আমার দুর্দশার কথা বলেছি, তিনি একবারও বিরক্ত হননি।”

গণশুনানিতে সহায়তা পেয়েছেন এক মেধাবী শিক্ষার্থীও। সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ-এর ছাত্রী আয়েশা আক্তার উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে সহায়তা চান। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে স্নাতকোত্তরে ভর্তির খরচ জোগাড় করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। বিষয়টি শুনে তাকে শিক্ষা সহায়তা দেওয়া হয়, যাতে তার পড়াশোনার পথ বন্ধ না হয়ে যায়।

এদিন সহায়তা পান চার সন্তানের পড়াশোনার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা কৃষক মোকারম আলীও। পাশাপাশি ক্যানসার আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া হকার অমর দে, হৃদরোগে আক্রান্ত কুসুম আক্তার এবং কিডনির পাথর অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা মিনু আক্তারের মতো আরও অনেক অসহায় মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা।

নিজের অসুস্থতা ও চরম আর্থিক সংকটের কারণে মেয়ের বিয়ে দিতে না পারা দিনমজুর বছির আহমেদও সেদিন এসেছিলেন শেষ ভরসা নিয়ে। তার কথা শুনে তাকেও নিরাশ করেননি জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর এলাকা থেকে আসা মোট ৬২ জন সেবাপ্রত্যাশীর সমস্যা শোনেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। নাগরিকদের আবেদন, অভাব-অভিযোগ ও ব্যক্তিগত সমস্যার বিষয়ে গণশুনানি গ্রহণ করে সেগুলোর সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন তিনি।

এ সময় গুরুতর অসুস্থ ১২ জন ব্যক্তি, এক শিক্ষার্থী এবং মেয়ের বিয়ের জন্য দুইজন বাবাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে একটি হুইলচেয়ার প্রদান করা হয়।

পাশাপাশি ৩৪ জন দুস্থ নারী-পুরুষের মধ্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়া গুঁড়াসহ ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। কিছু আবেদন ও অভিযোগের তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

গণশুনানি শেষে উপস্থিত কয়েকজন আবেদনকারী জানান, আগে তারা ভাবতেন বড় কর্মকর্তাদের কাছে নিজেদের কথা বলা কঠিন। কিন্তু জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলামের মানবিক আচরণ তাদের সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।

মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা ইতোমধ্যেই অনেকের কাছে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মনে নতুন আস্থা তৈরি করছে—প্রশাসন চাইলে সত্যিই মানুষের খুব কাছাকাছি থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন: নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দেয়ার প্রক্রিয়া বৈধ, লিভ টু আপিল খারিজ

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন