বিজ্ঞাপন

শিক্ষাবঞ্চিত শিশু ও অসহায়দের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্য দোলন

ঢাকার পলাশীর মোড় এলাকার ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে বসবাস বেশ কয়েকটি ছিন্ন মূল পরিবারের। সেই সব পরিবারের অনান্য সদস্যদের মতো বেড়ে উঠছে শিশুরাও। শিক্ষা সুবিধা বঞ্চিত হওয়ায় অনেক শিশুই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে শিক্ষা থেকে। শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে ভিক্ষা বৃত্তি, ছিনতাই বা নেশার মতো ভয়াবহ অপরাধের সাথে। তাদের পিতামাতা বা অভিভাবকগণ জানে না শিশুদের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম একটি মৌলিক চাহিদা হলো শিক্ষা। ফুটপাত বা বস্তিতে বেড়ে উঠা এই শিশুদের মধ্যেও রয়েছে সুপ্ত প্রতিভা।

বিজ্ঞাপন

ডিএমপি ঢাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্য দোলন ছাত্র জীবন থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন সমাজের পিছিয়ে পড়া অসহায় জনগোষ্ঠীর কল্যানে। সেই ধারাবাহিকতায় ডিএমপিতে যোগদানের পর তিনি নানান সেবামূলক কাজের পাশাপাশি ঢাকার পলাশীর মোড়ে কয়েকজন সেচ্ছাসেবীর সহায়তায় চালু করেন মানবিক পাঠশালা।

পলাশীর মোড়ে ২৬ জন পথশিশুকে নিয়ে শুরু করেন ঢাকার পলাশীর এই মানবিক পাঠশালা। কখনো সেচ্ছাসেবীরা তাদের ক্লাস নেয় কখনো বা ডিউটির পর অবসর সময়ে ক্লাস নিতে তাদের কাছে ছুটে যান পুলিশের এই মানবিক সদস্য।

তার চাকরী জীবনের শুরুটা হয় বান্দরবান পার্বত্য জেলায়। সেখানে দূগর্ম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বান্দরবানের সেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় শুরু করেন মানবিক পাঠশালা। প্রায় ৬৮(আটষট্টি) জন শিক্ষাথর্ী নিয়ে বান্দরবানের সদর উপজেলার মুসলিম পাড়ায় শুরু করেন মানবিক পাঠশালাটি।

সেই পাঠশালায় পড়ালেখা করে উচ্চ মাধ্যমিক পযার্য়ে পড়ালেখা করছে অনেক শিক্ষার্থী। পরবর্তী সময়ে দোলন যেখানে বদলী হয়েছেন সেখানেই গড়ে তুলেছেন শিক্ষা বঞ্চিত শিশুদের জন্য এই মানবিক পাঠশালা। চট্টগ্রামের ঝাউতলা রেললাইনের পাশে বস্তিতে বসবাস করা শিশুদের জন্য এবং তার নিজ জেলা লক্ষীপুরেও তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন মানবিক পাঠশালা।

এসব পাঠশালা গুলোতে তিনি মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের জন্য বই,খাতা, কলম, ইউনিফর্ম, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য ব্রাশ, টুথপেষ্ট, নেইল কাটার ইত্যাদি বিতরন করেন। শিক্ষা সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য মানবিক পাঠশালার এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়া এবং শিক্ষা সুবিধা বঞ্চিত এই শিশুদেরকে স্ব-শিক্ষিত ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে আমার এই প্রচেষ্টা। শিক্ষা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশাপাশি তিনি কাজ করেন স্বামী হারা বিধবা ও সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য। সম্প্রতি ঢাকার আজিমপুর এলাকায় রাস্তার ফুটপাতে দীর্ঘ তের বছর ধরে সেলাই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা কর্মউদ্দ্যেমী নারী কল্পনা রানী দাশের সেলাই মেশিনটি চুরি হয়ে যায় রাতের আধারে। বন্ধ হয়ে যায় তার রুটি রোজগারের পথটি। আয়ের পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসুস্থ্য স্বামী আর তিন সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেন কল্পনা রানী দাশ। পুলিশ সদস্য দোলন তার বেতনের জমানো টাকা দিয়ে কল্পনা রানী দাশকে কিনে একটি সেলাই মেশিন। ঘুড়ে দাড়ঁায় কল্পনা রানী দাশ , অভাব গুচে যায় তার পরিবারের। ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের স্বামীহারা নারী রেনু বেগম জীবিকার তাগিদে ৮৫ বছর বয়সে দৈনিক ১২০ টাকা মজুরীতে ইট ভাঙ্গার কাজ করতেন।

মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটায় রেনু বেগম। চলার পথে একদিন কথা হয় দোলনের সাথে। রেনু বেগম বলেন তার জীবনের কষ্টের কথা গুলো। দোলন তার বেতনের টাকা দিয়ে রেনু বেগমকে কিনে দেন একটি ভ্যান । ভ্যান টি ভাড়া দিয়ে রেনু বেগম দৈনিক ১৫০ টাকা পান। আর তা দিয়েই চলে রেনু বেগমের সংসার। ইট ভাঙ্গার মতো হাড় ভাঙ্গা খাটুনির কাজ ৮৫ বছর বয়সে করতে হয় না আর রেনু বেগমকে। এমনি অসংখ্য অসহায় সুবিধা বঞ্চিত এবং স্বামী হারা বিধবা ও সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের কল্যানে কাজ করে যাচ্ছেন পুলিশের এই মানবিক সদস্য। এছাড়াও পরিবার পরিজনহীন প্রবীনদের নিয়ে কাজ করার কথা বলতে গিয়ে দোলন জানান, লক্ষীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার ০৬ নং পাটারীর হাট ইউনিয়নের খায়েরহাট এলাকার বাসিন্দা মোঃ কাদির মিয়া তার অসুস্থ্য স্ত্রীকে খুব মানবেতর দিন কাটাতো।

নিঃসন্তান এই দম্পতির নেই কোন ছেলে সন্তান। কাদের মিয়ার স্ত্রী দীর্ঘ ১২(বার) বছর ধরে ঘরে প্যারালাইসড আক্রান্ত হয়ে শয্যাসায়ী। উপার্জনক্ষম কোন ব্যক্তি না থাকায় খুব কষ্টে দিন কাটাতো তারা। ট্রলার ডুবিতে স্বামী মারা যাওয়ায় তার ছোট মেয়ে দুই নাতনি নিয়ে আশ্রয় নেয় বাবার ঘরে। কাদির মিয়ার পলিথিন টাঙ্গানো ঘরটিতে বসবাস করতো ০৫ (পাঁচ) সদস্য নিয়ে। বিধবা মেয়ে, দুই নাতনি ও প্যারালাইজড আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে খুব মানবেতর দিন কাটাতো কাদির মিয়া। যেখানে দুই বেলা খাবার জোটাতে হাত পাততে হতো মানুষের কাছে সেখানে ভালো ঘরে থাকা ছিল আকাশচুম্বী স্বপ্ন। পৈতিক ভিটা মাটিতে বসবাস করলেও ঘর করার সামর্থ্য ছিলো না কাদির মিয়ার। পুলিশ সদস্য মোঃ দোলন তার প্রতিবেশীদের মাধ্যমে কাদির মিয়া নিদারুন কষ্টের জীবনযাপনের কথা জানতে পারে। পুলিশ সদস্য দোলনের অসহায় মানুষদের কল্যানে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ গুলোতে সাড়া দেয় তার পরিচিতজনরা। ফেইসবুকের কল্যানে অনেকেই এগিয়ে আসে তার নেওয়া কল্যান মূলক এই উদ্যোগ গুলোতে। তেমনি কাদির মিয়ার জীবনের কষ্টের কথা গুলো তুলে ধরে পুলিশ সদস্য দোলন ফেইসবুকে আপলোড করে কাদির মিয়ার ঝুপরি ঘরের একটি ছবি। ফেইসবুকে ছবি দেখে পুলিশ সদস্য দোলনের সৌদি প্রবাসী বন্ধু শাহিন এগিয়ে আসে এবং কাদির মিয়ার জীবনের অপরাহেৃ তার স্বপ্নের ঠিকানা একটি ঘর নির্মান করে দেয়। সেই সাথে দোলন কাদির মিয়ার সংসারে উপার্জনের লক্ষ্যে বিধবা মেয়ে আসমা বেগমকে সেলাই কাজ শেখানোর ব্যবস্থা করে এবং একটি সেলাই মেশিন ও কিছু কাটা কাপড় কিনে দেয়। কাদির মিয়ার অসুস্থ্য স্ত্রীর জন্য ব্যবস্থা করেন একটি হুইল চেয়ারের। পুলিশ সদস্য দোলনের মানবিকতায় বদলে যায় কাদির মিয়ার জীবন ধারা।

মেয়ের সেলাই কাজের আয় দিয়ে ভালোভাবে চলছে তাদের জীবন। ঝড় বৃষ্টি আসলে অসুস্থ্য স্ত্রীকে নিয়ে আগে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিতো। ঝরঝর করে পানি পরতো ঘর দিয়ে। দোলনের প্রচেষ্টায় ঘর পেয়ে প্যারালাইজড আক্রান্ত অসুস্থ্য স্ত্রী আর বিধবা মেয়েকে নিয়ে সুখে বসবাস করছেন কাদির মিয়া।

কাদির মিয়া বলেন “ বাবা আমি জীবনে ভাবি নাই আমার এমন ঘর হবে, মৃত্যুর আগ পযন্র্Í আমনেগো জন্য দোয়া করমু, আমিও খুশি আমার আল্লাহও খুশি, শোকরিয়া”। কাদির মিয়ার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন “ ১২ বছর ধইরা অসুখে পইরা রইছি কেউ খবর নেয় নাই, বাইরে বের হইতে পারি নাই, চলার মতো এই গাড়িটা পাই আমি অনেক খুশি ,আমি আমনেগো জন্য দোয়া করমু, আমি অহন নিজে নিজে বের হইতে পারি গাড়িতে চড়ে, আমার অনেক ভালো লাগছে। আমনেগরে দোয়া করি”। পুলিশ সদস্য দোলন বলেন আমি এমন অসংখ্য অসহায় মানুষের হাসি মুখের কারন হয়েছি। ছোট্ট এই জীবনে চেষ্টা করেছি অসহায় মানুষের কল্যানে কাজ করার বাকী জীবনটাও করে যাবো ইনশাআল্লাহ। চাকরী জীবনের শুরুটা বান্দরবান পার্বত্য জেলায় এবং পরবতর্ীতে চট্টগ্রাম জেলায়। সেই সব কর্মস্থল সমূহেও রেখেছেন প্রশংসনীয় ভূমিকা। পুলিশের এই মানবিক সদস্য শুধু সমাজের পিছিয়ে অসহায় মানুষের জন্য নয় কাজ করেছেন পরিবেশ প্রকৃতি এবং জলবায়ু নিয়ে। পরিবেশ প্রেমী দোলন বান্দরবান পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম, লক্ষীপুর এবং ঢাকায় পরিবেশ রক্ষায় রোপন করেছেন সাতাশ হাজার গাছের চারা। মানুষকে উদুদ্ধ করেন প্লাষ্টিক জাতীয় পন্যের ব্যবহার কমিয়ে আনতে। বান্দরবানে দোলন করোনাকালীন সময়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে সেবা করেছেন করোনা আক্রান্তদের এবং পৌছে দিয়েছেন খাবার সামগ্রী। পুলিশ সদস্য দোলন এর করা এই মানবিক ও সমাজসেবা মূলক কাজের জন্য পেয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশ প্রধানের নিকট থেকে আইজিপি ব্যাজ ও বিভিন্ন জাতীয় সম্মাননা। তার করা এই মানবিক প্রচেষ্টা গুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ছাত্রজীবন থেকেই চেষ্টা করি অসহায় মানুষের কল্যানে কাজ করার সেই কাজগুলো আরো বড় পরিসরে করার সুযোগ হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করার ফলে। পুলিশে যোগদানের ফলেই প্রান্তিক অঞ্চল ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় অসহায় মানুষদেরকে খুব কাছ থেকে সেবা করার সুযোগ হয়েছে এবং তাদেরকে ভালোবাসতে পেরেছি।

তিনি বলেন একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে যখন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই , তখন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি বহুগুন বেড়ে যায়। দোলন বলেন স্বপ্ন দেখি ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত থাকবে সমাজ। ভিক্ষাবৃত্তি আর পরনির্ভরশীলতা কমে প্রতিটি মানুষ হবে আত্মনির্ভরশীল। আর পৃথিবীকে বাঁচলে হলে পরিবেশদূষন বন্ধ করতে হবে, পরিবেশ রক্ষায় লাগাতে হবে গাছ। পুলিশের এই মানবিক প্রান বর্তমানে কর্মরত আছেন ডিএমপি ঢাকার লালবাগ ডিভিশনে।

পড়ুন- ৪২ জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ

দেখুন- পূর্ব ঘোষণা দিয়ে হা/ম/লা চালাতে চাইছে ইরান!

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন