বিজ্ঞাপন

ঝালকাঠিতে স্বাধীনতা দিবসে শ্রদ্ধা জানিয়েই গাছ কাটার প্রতিবাদ

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে ঝালকাঠি মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পরেই প্ল্যাকার্ড হাতে দুই হাজার গাছ কাটার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে ঝালকাঠি গাছপালা-নদীনালা রক্ষা আন্দোলন কমিটির নেতৃবৃন্দরা।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান নদীর পাড়ে পুরাতন রাস্তার দুই পাশে ৪ কিলোমিটার এলাকায় প্রায় দুই হাজার গাছ কাটতে শুরু করে বন বিভাগ।

দরপত্রের দ্বারা ঠিকাদারদের মাধ্যমে পবিত্র রমজান মাসে অতি মূল্যবান ১৬০টি গাছ কেটেছে বন বিভাগ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি লিখে পরিবেশকর্মী ইসমাঈল মুসাফির গাছ কাটা বন্ধের অনুরোধ জানালে বন বিভাগকে গাছ কাটা স্থগিতের নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন।

এরপর সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের (HRPB) চেয়রাম্যান এডভোকেট মনজিল মোরশেদ উচ্চ আদালতে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি আসিফ হাসানের দেয়া একটি রায়ের আলোকে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসককে পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটি করার পরামর্শ দেন।

উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে কমিটিতে যাদের রাখতে হবে তাদের তড়িঘড়ি আমন্ত্রণ জানিয়ে জেলা প্রশাসক ঈদের কয়েকদিন আগেই একটি মিটিং সেরে নেন। যে কমিটি বিশেষজ্ঞ দল হিসেবে পরামর্শ দেবে গাছ কাটা যাবে কি যাবে না- অথচ সেটি না করে তাদেরকে পূর্বের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বুঝিয়ে গাছ কাটার পক্ষে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

ওই মিটিংয়ে ঝালকাঠি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ উপস্থিত থাকার কথা। কিন্তু তার পক্ষে অন্য একজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট শাহাদাৎ হোসেন উপস্থিত থাকলেও তিনি গাছ কাটার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বলে জানিয়েছেন কমিটির আরেক সদস্য পরিবেশকর্মী ইলিয়াস সিকদার ফরহাদ।

তিনি জানান, জেলা প্রশাসক আমাদের বুঝিয়েছেন আগেই গাছ কাটার জন্য দুটি রেজুলেশন হয়েছে, টেন্ডার হয়েছে- এখন উন্নয়নওতো দরকার। প্রয়োজনে একটি গাছ কাটার সঙ্গে সঙ্গে ১০টি লাগানো হবে। কিন্তু দুই হাজার গাছ কাটার কথা বলা হয়নি।

ইলিয়াস সিকদার ফরহাদ সেদিন উপস্থিতির স্বাক্ষর দিয়ে আসলেও ঈদের ছুটির পরে ২৪ মার্চ আগের মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের ওপর আপত্তির কথা জেলা প্রশাসককে মৌখিকভাবে জানান।

কমিটির আরেক সদস্য সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ুন কবিরও উন্নয়নের জন্য গাছ কাটার পক্ষে মত দেন। দুই হাজার গাছ কাটা হবে জানতেন কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন- না এটা জানতাম না।

আজকের প্রতিবাদ প্রসঙ্গে ঝালকাঠি গাছপালা-নদীনালা রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি এডভোকেট আককাস সিকদার বলেন, সবাইকে গাছ রক্ষার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে হবে। উন্নয়নের নামে এক নিমিষে দুই হাজার গাছ কাটার সিদ্ধান্ত একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারি না। গাছ ছাড়া প্রাণপ্রকৃতি অচল। শত প্রজাতির পাখি ও বিরল প্রজাতির সরীসৃপের আবাসস্থল গাবখান নদীর পাড়। এই দুই হাজার গাছ বাঁচাতে মুক্তিযোদ্ধা স্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েই আমরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানিয়েছি।

এ সময় দেখা যায় পরিবেশকর্মীরা প্ল্যাকার্ডে বিভিন্ন লেখা ও আঁকা ছবির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান।

প্ল্যাকার্ডে উল্লেখ করা হয় “পরিবেশ নিয়ে টেন্ডারবাজি বন্ধ হোক”; প্রশাসন! গাছ রক্ষার টিকা গ্রহণ করো; ২০০০ গাছ কাটার সিদ্ধান্ত মানি না; একটি গাছ দিনে ১০০ জনকে অক্সিজেন দেয়; গাছ নেইতো পাখির ঘর নেই ইত্যাদি প্রতিবাদি বাক্য।

সরেজমিনে গাবখান এলাকায় দেখা যায়, গাবখান নদীর পাড়ে ব্লক ফেলতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প চলমান। নদীর পাড়েই পুরাতন এবং নতুন দুটি রাস্তা। গাবখান বাজার থেকে বারুহার পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এলাকায় পুরাতন রাস্তাটি থেকে নদীর পানি পর্যন্ত শুকনো পাড় গড়ে ২০ ফুটের (শীতের মৌসুমে) বেশি। কোথাও পাড়ের জায়গা এর চেয়ে দ্বিগুণ। অনেক জায়গায় জিও ব্যাগ পর্যন্ত পাড় ৫০ ফুটেরও বেশি। পাড়ে এতো জায়গা থাকার পরেও উঁচু পুরান রাস্তাটিতেও ব্লক ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়া তাদের পরিকল্পনায় আছে পুরান রাস্তার দুই পাড়ে থাকা সব গাছ কাটার নির্দেশনা।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী দেড় বছর ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে গাছ কাটতে বলার পরে কয়েক দফা মিটিংয়ের পরে কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসক গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছেন।

সেই অনুযায়ী ৪৭টি লটে ১৮১৫টি গাছ কাটার জন্য বন বিভাগ চিহ্নিত করে। এর আগে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারদের কাছে এই কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। আর এই ১৮১৫টি গাছের বিনিময় মূল্য উঠেছিলো মাত্র ৬০ লাখ টাকা।

বন বিভাগ থেকে পাওয়া নথিতে দেখা যায় একেক লটে গড়ে ৪০টি করে গাছ রাখা হয়েছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে একেকটি লটে ৫০টি করে গাছ কাটা হবে। সেই হিসেব মতে অন্তত ২৩৫০টি গাছ কাটা পড়বে।

বন বিভাগের নথি অনুযায়ী তালিকায় থাকা ১৮০০ এর বেশি গাছের বিশ্লেষণ করে মিলেছে ৩০ প্রজাতির গাছ। যার মধ্যে রয়েছে ওষুধি গাছ অর্জুন ৩৩৪টি, নিম ৭৮টি ও তেঁতুল গাছ ২০টি। এছাড়া বিলুপ্তপ্রায় রাজ কড়াই ১১১টি, সেগুন ২৫টি, কড়াই ৩৪টি, উড়িআম ১১টি ও ডেউয়া গাছ দুটি। মূল্যবান গাছের মধ্যে আছে শিশু ২৫২, জারুল ৭৩, মেহগনি ১৯০ দ্বৈত গুণসম্পন্ন গাছের মধ্যে তুলা ১৪০ এবং ফলদ গাছের মধ্যে আছে কাঁঠাল, জাম, আম, আমলকি, ডাব ও তালগাছ।
সিনিয়র আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মনজিল মোরশেদ বলেন, দুই হাজার গাছের দাম মাত্র ৬০ লাখ টাকা কী করে হয়? এখানেতো কয়েক কোটি টাকার গাছ। এরপর গাছ কাটতে কমিটি সংশোধনের কথা বলা হলেও কমিটির কোনো পরিদর্শন ছাড়াই একটি নামমাত্র মিটিং করে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত বহাল রাখাতো সত্যিই দুঃখজনক।

ঝালকাঠি জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকার জানান, সমস্ত নিয়ম মেনে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছ বিক্রি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশে গাছ কাটা স্থগিত করা হয়েছিলো। ঈদের আগে আবার মিটিং করে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আপাতত গাছ কাটা বন্ধ আছে।

পড়ুন:হিলিতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা দিবস পালিত

দেখুন:মাদারীপুরে দুই বাসের মুখোমুখি সং/ঘ/র্ষ 

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন